বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, প্রতিরক্ষা শিল্পের সম্প্রসারণ এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহ নিরাপত্তা নিয়ে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতার মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার তাসমানিয়ার কিং দ্বীপে অবস্থিত ডলফিন টাংস্টেন খনি আবারও কৌশলগত গুরুত্বের কেন্দ্রে উঠে এসেছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা এই খনিতে পুনরায় উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং ২০২৬ সালের তৃতীয় প্রান্তিকের শেষদিকে ভূগর্ভস্থ উচ্চমানের আকরিক মজুতের সঙ্গে উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। খনিটিতে বিপুল পরিমাণ টাংস্টেনের মজুত রয়েছে, আর এই ধাতু উচ্চশক্তির সংকর ধাতু, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবারুদ, বিমান ও মহাকাশ প্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি এবং শিল্পকারখানার কঠিন কাটার তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। অস্ট্রেলিয়া টাংস্টেনকে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ হিসেবে বিবেচনা করছে। কিং দ্বীপের এই খনির ইতিহাসও যুদ্ধ ও বৈশ্বিক শিল্পচাহিদার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ১৯১৭ সালে প্রথম খনন শুরু হওয়ার পর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় এর গুরুত্ব বাড়ে; পরে দাম ও চাহিদা কমে গেলে খনি বন্ধ হয়ে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ১৯৩৮ সালে এটি আবার চালু হয় এবং যুদ্ধকালীন চাহিদায় উৎপাদন বাড়ে। কোরীয় ও ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়ও টাংস্টেনের চাহিদা খনিটির কার্যক্রমে প্রভাব ফেলে। দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার পর ২০২২ সালে পুনঃউন্নয়ন শুরু হয় এবং ২০২৩ সালে বাণিজ্যিকভাবে টাংস্টেনের ঘনসার উৎপাদন শুরু হয়েছিল। এখন পুরোদমে উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের গুরুত্ব শুধু অস্ট্রেলিয়ার খনিজ খাতেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে টাংস্টেনের বৈশ্বিক সরবরাহ ও ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা। বিশ্বের বিপুল অংশের টাংস্টেন চীন উৎপাদন করায় যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও অন্যান্য দেশ চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে বিকল্প উৎস খুঁজছে। একই কারণে কাজাখস্তানের বৃহৎ টাংস্টেন মজুতসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রকল্প ঘিরেও নতুন বিনিয়োগ ও কৌশলগত তৎপরতা বাড়ছে। ফলে কিং দ্বীপের ডলফিন খনির পুনরুজ্জীবনকে শুধু একটি পুরনো খনি পুনরায় চালুর ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি গুরুত্বপূর্ণ খনিজের নিরাপদ সরবরাহ নিশ্চিত করা, প্রতিরক্ষা শিল্পের কাঁচামাল জোগান দেওয়া এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় বিকল্প উৎস গড়ে তোলার বৃহত্তর প্রতিযোগিতার অংশ। বিশ্বজুড়ে সামরিক ব্যয় ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে টাংস্টেনের মতো কৌশলগত খনিজের নিয়ন্ত্রণ আগামী দিনে অর্থনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।
