উত্তর কোরিয়ার হাতে ১২০টি পর্যন্ত পারমাণবিক ওয়ারহেড থাকতে পারে—দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এমন বক্তব্যে কোরীয় উপদ্বীপের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন গিউ-ব্যাক বৃহস্পতিবার সংসদীয় কমিটিকে জানান, বিভিন্ন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের হিসাব অনুযায়ী পিয়ংইয়ংয়ের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার আনুমানিক ৮০ থেকে ১২০টি ওয়ারহেডের মধ্যে হতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক দিন আগে উল্লেখ করা ৫৭টি পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যার তুলনায় অনেক বেশি। তবে সিউল স্পষ্ট করেছে, এই সংখ্যা দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনীর আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা কোনো হিসাব নয় এবং উত্তর কোরিয়ার প্রকৃত পারমাণবিক সক্ষমতার সঠিক পরিমাণ নির্ধারণ করা অত্যন্ত কঠিন। আন বলেন, গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুমান থেকে ৮০ থেকে ১২০টির একটি পরিসর পাওয়া গেলেও নির্দিষ্ট সংখ্যা নিশ্চিত করার সুযোগ নেই। এই হিসাব এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন ওয়াশিংটন ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যে দীর্ঘদিনের অচল কূটনৈতিক যোগাযোগ পুনরুজ্জীবিত করার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি চলতি বছরের শেষ দিকে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে আবার বৈঠক করতে চান। এর আগে ২০১৮ ও ২০১৯ সালে দুই নেতার মধ্যে একাধিক ঐতিহাসিক বৈঠক হলেও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, অর্থনৈতিক সুবিধা এবং উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে মতপার্থক্য দূর করা সম্ভব হয়নি। এবার সম্ভাব্য নতুন আলোচনার আগে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারের আকারই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে বড় কৌশলগত প্রশ্ন। দক্ষিণ কোরিয়া দীর্ঘদিন ধরে উত্তর কোরিয়াকে আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়ার নীতি অনুসরণ করে আসছে এবং পিয়ংইয়ংয়ের সম্পূর্ণ পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের পক্ষে অবস্থান বজায় রেখেছে। আনও জানিয়েছেন, সিউল নিজস্ব পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েনও গ্রহণ করা উচিত নয়; বরং দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ওপর নির্ভরতা অব্যাহত রাখবে। এদিকে ট্রাম্প প্রশাসন সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ সামরিক মহড়া কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে পিয়ংইয়ংকে কূটনৈতিকভাবে কাছে টানার একটি সম্ভাব্য পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কিন্তু উত্তর কোরিয়া এই সিদ্ধান্তকে যথেষ্ট ইতিবাচক সংকেত হিসেবে নেয়নি। কিম জং উনের প্রভাবশালী বোন কিম ইয়ো জং বলেছেন, মহড়ার সময় কমানো হলেও সেগুলো এখনো উসকানিমূলক ও আগ্রাসী এবং পিয়ংইয়ং এটিকে কোনো অর্থবহ শুভেচ্ছা পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করছে না। ফলে একদিকে ট্রাম্প ও কিমের সম্ভাব্য বৈঠক নতুন কূটনৈতিক সুযোগের ইঙ্গিত দিচ্ছে, অন্যদিকে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক সক্ষমতার বিস্তার আলোচনার ভবিষ্যৎকে আরও জটিল করে তুলছে। দক্ষিণ কোরিয়ার ৮০ থেকে ১২০টি ওয়ারহেডের অনুমান এবং ট্রাম্পের ৫৭টির হিসাবের বড় পার্থক্য উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক ভাণ্ডার সম্পর্কে বিদ্যমান অনিশ্চয়তাকেও স্পষ্ট করেছে। এখন প্রশ্ন হলো, পিয়ংইয়ংয়ের হাতে প্রকৃতপক্ষে কতগুলো পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে এবং সম্ভাব্য আলোচনায় উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক সক্ষমতা কীভাবে মোকাবিলা করা হবে। এই প্রশ্নের উত্তরই কোরীয় উপদ্বীপের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা, যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়া জোট এবং পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
