মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ ও অনিশ্চিত সামরিক দায়িত্ব পালনের কারণে মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের নাবিকদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নাবিকদের পরিবার ও সহকর্মীদের অভিযোগ, টানা দীর্ঘ সময় সমুদ্রে অবস্থান, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা এবং দেশে ফেরার নির্দিষ্ট তারিখ না থাকায় অনেক ক্রু সদস্য চরম ক্লান্তি ও হতাশার মধ্যে রয়েছেন। সাম্প্রতিক এক টাউন হল সভায় পরিবারগুলো মার্কিন নৌবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছে মানসিক স্বাস্থ্য ও আত্মহত্যার ঝুঁকি নিয়ে সরাসরি উদ্বেগ জানান।
সান ডিয়েগোতে অনুষ্ঠিত ওই সভায় আনুমানিক ২০০ জন উপস্থিত ছিলেন। সেখানে এক নাবিকের স্ত্রী কর্মকর্তাদের জানান, তাঁর স্বামী এমন একটি বার্তা পাঠিয়েছেন যাতে তিনি নিজের জীবন নিয়ে গভীর হতাশার ইঙ্গিত দিয়েছেন। পরিবারগুলোর বক্তব্যে আরও উঠে আসে, দীর্ঘ মোতায়েনের কারণে জাহাজে থাকা কয়েক হাজার নাবিকের মধ্যে মানসিক চাপ ক্রমেই বাড়ছে। নৌবাহিনীর কর্মকর্তারা অবশ্য জানান, জাহাজে মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী, চ্যাপলিন ও চিকিৎসকদের সহায়তা রয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
নাবিক ও তাঁদের পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, আব্রাহাম লিংকনের ক্রুরা ইতোমধ্যে অস্বাভাবিক দীর্ঘ সময় সমুদ্রে কাটিয়েছেন। নৌবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, জাহাজটি মোট প্রায় ২৫০ দিন সমুদ্রে থাকার নজির গড়েছে এবং এর মধ্যে প্রায় ৪০ দিন ইরানবিরোধী সরাসরি যুদ্ধাভিযানের সঙ্গে যুক্ত ছিল। গত নভেম্বরে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মোতায়েনের উদ্দেশ্যে সান ডিয়েগো ছাড়ার পর জাহাজটিকে পরে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। পূর্বনির্ধারিত সময়ের পরও মিশন দীর্ঘায়িত হওয়ায় ক্রুদের দেশে ফেরার প্রত্যাশা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
নাবিকদের অভিযোগের মধ্যে খাদ্য ও পানির সংকট, ডাক যোগাযোগে বিঘ্ন, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাবের কথাও রয়েছে। সাধারণ পরিস্থিতিতে দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার সময় বিমানবাহী রণতরিগুলোকে নিয়মিত বন্দরবিরতি দেওয়া হয়, যাতে রসদ সংগ্রহ, জাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ এবং ক্রুদের বিশ্রামের সুযোগ নিশ্চিত করা যায়। কিন্তু আব্রাহাম লিংকনের দীর্ঘ মোতায়েনে এমন বিরতি ছিল সীমিত। জুলাইয়ের শুরুতে ওমানের একটি বন্দরে সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতির সময় জাহাজে নতুন করে রসদ সরবরাহ করা হয় এবং কয়েক মাস পর ক্রুরা তাজা ফল ও শাকসবজি পান বলে নাবিকদের ভাষ্য।
তবে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও নাবিকদের মূল দাবি—দেশে ফেরার একটি নির্দিষ্ট তারিখ—এখনও পূরণ হয়নি। সামরিক নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে নৌবাহিনীর কর্মকর্তারা আব্রাহাম লিংকন কবে দেশে ফিরবে সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সূচি প্রকাশ করতে রাজি হননি বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। এই অনিশ্চয়তাই ক্রুদের মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে তাঁদের অভিযোগ।
পরিবারগুলোর উদ্বেগের সবচেয়ে গুরুতর দিকগুলোর একটি হলো আত্মহত্যার ঝুঁকি। নাবিকদের কয়েকজনের পরিবার জানিয়েছে, জাহাজে অন্তত একজন ক্রুকে সাগরে ঝাঁপ দেওয়া থেকে বিরত রাখার ঘটনা ঘটেছে বলে তাঁরা শুনেছেন। নির্দিষ্ট ওই ঘটনার বিষয়ে নৌবাহিনী সরাসরি মন্তব্য করেনি। তবে বাহিনী জানিয়েছে, আব্রাহাম লিংকন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপের সদস্যদের পাশে দাঁড়ানো এবং তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে কর্তৃপক্ষ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
নৌবাহিনীর কর্মকর্তারা আরও জানিয়েছেন, যুদ্ধজাহাজে পরামর্শক, চ্যাপলিন, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকসহ মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার একটি ব্যবস্থা চালু রয়েছে এবং পরিস্থিতি নিয়মিত মূল্যায়ন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সংঘাতপূর্ণ পরিবেশের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের প্রচলিত রসদ সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটলেও খাবার, স্বাস্থ্যসামগ্রী ও অন্যান্য জরুরি সরঞ্জামকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরবরাহ অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে বাহিনী।
সাম্প্রতিক সভাগুলোতে নৌবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সামনে পরিবারগুলোর ক্ষোভও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাঁদের অভিযোগ, নেতৃত্বের সঙ্গে নাবিক ও পরিবারের যোগাযোগে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। পরিবারগুলোর দাবি, দীর্ঘ মোতায়েনের শারীরিক ও মানসিক ক্ষয়ক্ষতি বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত একটি প্রত্যাবর্তন পরিকল্পনা জানানো প্রয়োজন।
সামরিক গবেষণাতেও দীর্ঘ মোতায়েনের সময় পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব, সীমিত স্বাস্থ্যসেবা এবং পরিবার-বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগের সমস্যাকে নাবিকদের মানসিক চাপের গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দীর্ঘদিন নৌবাহিনীতে দায়িত্ব পালন করা সাবেক কর্মকর্তাদের মতে, কোনো মিশন কবে শেষ হবে তা জানা না থাকলে অনিশ্চয়তা দ্রুত মনোবলকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
আব্রাহাম লিংকনের ক্ষেত্রে এখন মূল উদ্বেগ শুধু যুদ্ধাভিযানের ঝুঁকি নয়; দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকা, বিশ্রামের সীমিত সুযোগ এবং দেশে ফেরার অনিশ্চয়তাও ক্রুদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। নৌবাহিনী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা দেওয়ার কথা বললেও পরিবারের সদস্যরা একটি স্পষ্ট প্রত্যাবর্তন পরিকল্পনা চান। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক দায়িত্ব অব্যাহত থাকার পাশাপাশি নাবিকদের মানসিক সুস্থতা, নিরাপত্তা ও মানবিক প্রয়োজন কীভাবে নিশ্চিত করা হবে—তা এখন মার্কিন নৌবাহিনীর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে
