গাজা যুদ্ধ ঘিরে ইসরায়েলের কট্টর-ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের সাম্প্রতিক বক্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। গাজায় প্রতিরাতে ৩০ থেকে ৪০ জনকে হত্যা করার আহ্বান জানানো এবং কিছু ফিলিস্তিনিকে ‘বেঁচে থাকার যোগ্য নয়’ ও ‘মানুষ নয়’—এমন বক্তব্যের পর এবার জার্মানির শীর্ষ নেতৃত্ব সরাসরি এর নিন্দা জানিয়েছে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর্যায়ে বেন-গভিরের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার সম্ভাবনাও সামনে এসেছে।
বেন-গভির সাবেক হামাস-জিম্মি রোম ব্রাসলাভস্কির একটি পডকাস্টে এসব মন্তব্য করেন। সেখানে তিনি গাজায় শুধু তাৎক্ষণিক হুমকি হিসেবে বিবেচিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর পরিবর্তে আরও ব্যাপকভাবে ‘টার্গেটেড কিলিং’ চালানোর পক্ষে অবস্থান নেন এবং প্রতি রাতে ৩০ থেকে ৪০ জনকে হত্যার কথা বলেন। একই আলোচনায় তিনি গাজায় ইসরায়েলি বসতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার পক্ষেও নিজের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন।
এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় জার্মান ভাইস চ্যান্সেলর ও অর্থমন্ত্রী লার্স ক্লিংবাইল বলেন, বেন-গভিরের মন্তব্য ‘মানুষ-বিদ্বেষী’ এবং এর পরিণতি হওয়া উচিত। তিনি স্পষ্ট করেন, জার্মানি ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতি সংহতি বজায় রাখে, কিন্তু এমন বক্তব্য দেওয়া ইসরায়েলি মন্ত্রীদের সঙ্গে সেই সংহতি প্রযোজ্য নয়। একই সঙ্গে তিনি ইউরোপীয় পর্যায়ে বেন-গভিরের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা বিবেচনার আহ্বান জানান।
এরপর জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মেয়ার্জও প্রকাশ্যে বেন-গভিরের বক্তব্যের নিন্দা জানান। জার্মান সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, মেয়ার্জ এই মন্তব্যকে ‘অমানবিক’, আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী এবং ‘গ্রহণযোগ্য নয়’ বলে অভিহিত করেছেন। ফলে ইসরায়েলের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা জার্মানির পক্ষ থেকে সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েলি সরকারের কট্টরপন্থী অংশের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য সমালোচনার মাত্রা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে জার্মানির অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ইসরায়েল-জার্মানি সম্পর্কের পেছনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও হলোকাস্টের ঐতিহাসিক দায়বোধ একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বাস্তবতা। ফলে বার্লিন দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের নিরাপত্তাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। তবে গাজা যুদ্ধের মানবিক পরিস্থিতি এবং ইসরায়েলি সরকারের কিছু কট্টরপন্থী নেতার বক্তব্য নিয়ে ইউরোপের ভেতরে সমালোচনা ক্রমেই বাড়ছে। ফ্রান্সও বেন-গভিরের বক্তব্যকে ‘অগ্রহণযোগ্য ও অমানবিক’ বলে নিন্দা জানিয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে।
এদিকে জার্মানির এই কূটনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে গাজায় বাস্তব পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্যও সামনে এসেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গাজা পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে তাঁর দূত ও জামাতা জ্যারেড কুশনার ১৭ আগস্ট ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করেন। এর আগে কুশনার মিসরে হামাসের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও আলোচনা করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল যুদ্ধবিরতি ও গাজা-পরবর্তী রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিষয়ে অচলাবস্থা কাটানো। কিন্তু ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে নিরস্ত্রীকরণ, ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং গাজার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামো নিয়ে মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
কুশনারের নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকের পরদিন, ১৮ আগস্ট গাজা সিটির একটি বন্দর এলাকার ক্যাফেতে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ছয় ফিলিস্তিনি নিহত হন এবং আরও বেশ কয়েকজন আহত হন বলে গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। নিহতদের মধ্যে একটি শিশুও ছিল বলে স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী অবশ্য দাবি করেছে, হামলার লক্ষ্য ছিল হামাসের কয়েকজন কমান্ডার।
ঘটনাটির সময়কাল বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ মার্কিন কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে গাজায় সামরিক অভিযান কমানো এবং শান্তি পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চললেও নতুন হামলা সেই প্রচেষ্টার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কুশনারের সফরের পর মাত্র দুই দিনে গাজায় ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১৭ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে, ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে চলমান অচলাবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের প্রশ্ন। নেতানিয়াহু হামাসকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের ওপর জোর দিচ্ছেন; বিপরীতে হামাস বলছে, ইসরায়েলি প্রত্যাহার ও রাজনৈতিক সমাধানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এই মতপার্থক্যই যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি উদ্যোগকে বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে বেন-গভিরের বক্তব্য শুধু একজন মন্ত্রীর বিতর্কিত মন্তব্য হিসেবে নয়, বরং গাজা নিয়ে ইসরায়েলি সরকারের ভেতরের রাজনৈতিক বিভাজনের প্রতিফলন হিসেবেও দেখা হচ্ছে। একদিকে ওয়াশিংটন যুদ্ধের মাত্রা কমিয়ে রাজনৈতিক সমাধানের দিকে এগোতে চাইছে; অন্যদিকে ইসরায়েলি সরকারের কট্টর-ডানপন্থী অংশ আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপ, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতি এবং গাজার জনসংখ্যা নিয়ে কঠোর নীতির পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখন জার্মানি ও অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের প্রকাশ্য নিন্দা বাস্তবে কতটা নীতিগত পরিবর্তনে রূপ নেয়। বেন-গভিরের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য ইউরোপীয় নিষেধাজ্ঞা যদি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে তা ইসরায়েলি সরকারের কট্টরপন্থী মন্ত্রীদের ওপর পশ্চিমা মিত্রদের চাপ বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হতে পারে। তবে একই সঙ্গে জার্মানি ও ইউরোপীয় দেশগুলো ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের ঐতিহাসিক, কৌশলগত ও নিরাপত্তাগত সম্পর্ক কীভাবে বজায় রাখবে—সেটিও সামনে আসবে আরও কঠিন রাজনৈতিক পরীক্ষা হিসেবে।
গাজার মাটিতে meanwhile, কূটনৈতিক তৎপরতা ও যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টার পাশাপাশি হামলা অব্যাহত থাকায় প্রশ্নটি আরও গভীর হচ্ছে—আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিন্দা কি কেবল কূটনৈতিক বিবৃতিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি তা বেসামরিক মানুষের জীবন রক্ষায় কার্যকর রাজনৈতিক চাপ ও বাস্তব পদক্ষেপে রূপ নেবে?
