মানবজাতির ইতিহাসে এমন কোনো ব্যক্তিত্বের দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া কঠিন, যাঁর জীবন, আদর্শ, চরিত্র ও মানবকল্যাণের শিক্ষা কোটি কোটি মানুষের বিশ্বাস, নৈতিকতা ও জীবনযাত্রাকে এত গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে, যতটা করেছেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। ইসলামের দৃষ্টিতে তিনি শুধু একজন নবী ও রাসূল নন; তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত শেষ নবী, মানবতার জন্য হেদায়েতের পথপ্রদর্শক এবং সমগ্র জগতের জন্য রহমত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের প্রতি বড় অনুগ্রহ করেছেন, যখন তিনি তাদের মধ্য থেকেই তাদের কাছে একজন রাসূল পাঠিয়েছেন; যিনি তাদের কাছে তাঁর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করেন, তাদের পরিশুদ্ধ করেন এবং কিতাব ও হিকমাহ শিক্ষা দেন।” (সূরা আলে ইমরান, ৩:১৬৪) এই আয়াতের আলোকে বোঝা যায়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমন ছিল মানবজাতির জন্য আল্লাহর এক মহান অনুগ্রহ। তিনি এমন এক সমাজ নির্মাণ করেছিলেন, যার ভিত্তি ছিল ওহি, ন্যায়, তাকওয়া, মানবিক মর্যাদা, পারস্পরিক দায়িত্ববোধ ও আল্লাহর আনুগত্য। তাই তাঁর প্রতি ভালোবাসা শুধু আবেগের বিষয় নয়; বরং একজন মুমিনের ঈমান, চরিত্র ও জীবনাচরণের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি মৌলিক বিষয়।
পবিত্র কুরআন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দায়িত্ব ও মর্যাদা তুলে ধরে তাঁকে “রহমাতুল্লিল আলামিন”—অর্থাৎ বিশ্বজগতের জন্য রহমত—হিসেবে ঘোষণা করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, “আমি আপনাকে বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবেই পাঠিয়েছি।” (সূরা আম্বিয়া, ২১:১০৭) তাফসিরকারদের ব্যাখ্যায়, তাঁর এই রহমত মুমিনদের জন্য হেদায়েত, ঈমান ও নাজাতের পথ উন্মুক্ত করেছে এবং তাঁর মাধ্যমে মানবজাতি আল্লাহর পক্ষ থেকে সত্য দ্বীনের শিক্ষা পেয়েছে। তাঁর জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি ছিল উম্মতের প্রতি গভীর মমতা ও কল্যাণকামিতা। তিনি মানুষের ঈমান ও নাজাতের ব্যাপারে এতটাই ব্যাকুল ছিলেন যে, কুরআন তাঁর এই দরদকে অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী ভাষায় তুলে ধরেছে: “মনে হয়, তারা যদি এই বাণীর প্রতি ঈমান না আনে, তবে আপনি তাদের পিছনে পরিতাপ করতে করতে নিজেকে ধ্বংস করে ফেলবেন।” (সূরা কাহফ, ১৮:৬) অন্যত্র আল্লাহ তাআলা বলেন, “তোমাদের নিজেদের মধ্য থেকেই তোমাদের কাছে একজন রাসূল এসেছেন; তোমাদের যে কোনো কষ্ট তাঁর কাছে অত্যন্ত পীড়াদায়ক; তিনি তোমাদের কল্যাণের ব্যাপারে অত্যন্ত আগ্রহী এবং মুমিনদের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল ও পরম দয়ালু।” (সূরা তাওবা, ৯:১২৮)
উম্মতের প্রতি নবীজীর এই মমতার অসাধারণ উদাহরণ পাওয়া যায় সহিহ হাদিসে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, একসময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মতের কথা স্মরণ করে হাত তুলে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন, “হে আল্লাহ! আমার উম্মত, আমার উম্মত!” এরপর আল্লাহ তাআলা জিবরাঈল আলাইহিস সালামকে পাঠিয়ে তাঁর কান্নার কারণ জানতে বলেন এবং তাঁকে সুসংবাদ দেওয়া হয় যে, তাঁর উম্মতের ব্যাপারে তাঁকে সন্তুষ্ট করা হবে এবং তাঁকে দুঃখিত করা হবে না। (সহিহ মুসলিম, হাদিস ২০২) এই বর্ণনা নবীজীর অন্তরে উম্মতের জন্য যে গভীর দরদ ছিল, তার এক অসাধারণ প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মতকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করার জন্য একজন সতর্ককারী অভিভাবকের মতো ছিলেন। তিনি একটি দৃষ্টান্ত দিয়ে বলেছেন, তাঁর ও উম্মতের সম্পর্ক সেই ব্যক্তির মতো, যে আগুন জ্বালানোর পর পতঙ্গগুলো আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়তে থাকলে সেগুলোকে আগুন থেকে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করে; তেমনি তিনি মানুষকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করতে চেষ্টা করছেন, অথচ মানুষ তাঁর হাত থেকে ছুটে যেতে চাইছে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস ২২৮৫) এই বর্ণনার মধ্যে নবীজীর দাওয়াতি দায়িত্বের পাশাপাশি মানুষের পরিণতি নিয়ে তাঁর গভীর উদ্বেগও প্রকাশ পেয়েছে।
তায়েফের ঘটনা তাঁর রহমত ও ক্ষমাশীলতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তাওহীদের দাওয়াত নিয়ে তিনি তায়েফে গিয়েছিলেন; কিন্তু সেখানকার লোকেরা তাঁর আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে তাঁকে পাথর নিক্ষেপ করে রক্তাক্ত করে দেয়। এমন নির্মম নির্যাতনের পরও যখন পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা এসে জানালেন যে, তিনি চাইলে দুই পাহাড়ের মাঝে তাদের পিষে ফেলতে পারেন, তখন রহমতের নবী প্রতিশোধের পথ বেছে নেননি। বরং তিনি আশা প্রকাশ করেন, তাদের বংশধরদের মধ্য থেকে এমন মানুষ জন্ম নেবে যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করবে না। (সহিহ বুখারি, হাদিস ৩২৩১; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৭৯৫) ইতিহাসের এই ঘটনা দেখিয়ে দেয়, ব্যক্তিগত নির্যাতন ও অপমানের মুখেও তাঁর দয়া ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হেদায়েতের আকাঙ্ক্ষা প্রতিশোধের ইচ্ছাকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
উম্মতের পার্থিব দুর্দশার প্রতিও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দায়িত্ববোধ ছিল গভীর। তিনি বলেছেন, প্রত্যেক মুমিনের জন্য তিনি দুনিয়া ও আখিরাতে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ; কোনো মুমিন সম্পদ রেখে গেলে তার উত্তরাধিকারীরা তা পাবে, কিন্তু কেউ ঋণ বা অসহায় পরিবার রেখে গেলে সে যেন তাঁর কাছে আসে—তিনি তার অভিভাবক। (সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৭৮১) এই বক্তব্যে একজন রাষ্ট্রনায়ক, সমাজসংস্কারক ও আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক হিসেবে তাঁর দায়িত্ববোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ফুটে ওঠে।
কিন্তু যে নবী তাঁর উম্মতের জন্য এতটা দরদী ছিলেন, তাঁর প্রতি উম্মতের দায়িত্ব কী? ইসলামী শিক্ষার অন্যতম মৌলিক উত্তর হলো—রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ভালোবাসা ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি এবং সমগ্র মানুষের চেয়েও বেশি প্রিয় হই।” (সহিহ বুখারি, হাদিস ১৫) অর্থাৎ নবীপ্রেম শুধু মুখের দাবি নয়; বরং জীবনের মূল্যবোধ, সিদ্ধান্ত ও আনুগত্যের ক্ষেত্রে তাঁর আদর্শকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দেওয়ার নামও নবীপ্রেম।
হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর জীবনের একটি বিখ্যাত ঘটনা এই সত্যকে আরও স্পষ্ট করে। তিনি একসময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানান যে, তিনি তাঁকে নিজের সবকিছুর চেয়ে বেশি ভালোবাসেন, তবে নিজের জীবনকে বাদ দিয়ে। তখন নবীজী বলেন, যতক্ষণ না তিনি নিজের জীবনের চেয়েও প্রিয় হন, ততক্ষণ ঈমানের পূর্ণতা অর্জিত হবে না। পরে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, এখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর নিজের জীবনের চেয়েও প্রিয়। তখন নবীজী বলেন, “এখন, হে উমর।” (সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৬৩২) এই ঘটনা বোঝায় যে, নবীপ্রেমের সর্বোচ্চ প্রকাশ হলো তাঁর আদর্শ ও নির্দেশকে নিজের প্রবৃত্তি, স্বার্থ ও পছন্দের ওপর প্রাধান্য দেওয়া।
ঈমানের সঙ্গে নবীপ্রেমের সম্পর্ক শুধু নৈতিক নয়, আধ্যাত্মিকও। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তিনটি গুণ যার মধ্যে থাকবে সে ঈমানের স্বাদ অনুভব করবে; তার মধ্যে অন্যতম হলো—আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তার কাছে অন্য সবকিছুর চেয়ে বেশি প্রিয় হওয়া। (সহিহ মুসলিম, হাদিস ৬৭) অর্থাৎ সত্যিকারের নবীপ্রেম মানুষের অন্তরকে আল্লাহর আনুগত্য, ইবাদত ও নৈতিকতার দিকে পরিচালিত করে। ভালোবাসা তখন কেবল অনুভূতি থাকে না; তা জীবনের বাস্তব পরিবর্তনের শক্তিতে পরিণত হয়।
এই কারণেই ইসলামী ঐতিহ্যে বলা হয়েছে, ভালোবাসার স্বাভাবিক দাবি হলো আনুগত্য। যে ব্যক্তি সত্যিকার অর্থে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভালোবাসে, তার জীবনে তাঁর সুন্নাহর প্রভাব দেখা যাবে। তাঁর কথা, চরিত্র, ইবাদত, লেনদেন, পারিবারিক আচরণ, প্রতিবেশীর অধিকার, দুর্বল মানুষের প্রতি সহমর্মিতা এবং ন্যায়বিচারের আদর্শ অনুসরণ করার মধ্য দিয়েই নবীপ্রেমের বাস্তব প্রকাশ ঘটে। শুধু আবেগ প্রকাশ নয়, বরং সুন্নাহকে জীবনের পথনির্দেশে পরিণত করাই ভালোবাসার অধিক গভীর ও অর্থবহ রূপ।
নবীজীর প্রতি ভালোবাসার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ হলো তাঁর প্রতি দরুদ ও সালাম পাঠ করা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতারা নবীর প্রতি সালাত প্রেরণ করেন। হে মুমিনগণ! তোমরাও তাঁর প্রতি সালাত ও সালাম পেশ কর।” (সূরা আহযাব, ৩৩:৫৬) তাই নবীপ্রেমিকের জীবনে দরুদ একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল। তাঁর নাম উচ্চারিত হলে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে সালাত ও সালাম পাঠ করা মুসলিমের আধ্যাত্মিক জীবনের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে।
সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম ছিলেন নবীপ্রেমের সবচেয়ে উজ্জ্বল বাস্তব উদাহরণ। ইসলাম গ্রহণের আগেই আবু সুফিয়ান রাদিয়াল্লাহু আনহু স্বীকার করেছিলেন যে, তিনি কোনো মানুষকে তাঁর সঙ্গীদের কাছে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মতো প্রিয় হতে দেখেননি। হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় মুশরিকদের প্রতিনিধি হিসেবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে উরওয়া ইবনে মাসউদও তাঁর সাহাবিদের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও আনুগত্য দেখে গভীরভাবে বিস্মিত হয়েছিলেন। সহিহ বুখারির বর্ণনায় তাঁর পর্যবেক্ষণ থেকে বোঝা যায়, সাহাবিরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ পালনে কতটা আন্তরিক ছিলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস ২৫৮১)
হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চুল মুবারক কাটার সময় সাহাবিরা তাঁকে ঘিরে ছিলেন এবং চেষ্টা করতেন যেন তাঁর একটি চুলও মাটিতে না পড়ে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৩২৫) এসব ঘটনা সাহাবিদের হৃদয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার চিত্র তুলে ধরে।
হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহুর শেষ জীবনের একটি ঘটনাও নবীপ্রেমের গভীরতা প্রকাশ করে। মৃত্যুশয্যায় তিনি জানতে চেয়েছিলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন দিনে ইন্তেকাল করেছিলেন। যখন তাঁকে জানানো হলো যে দিনটি সোমবার, তখন তিনি আশা প্রকাশ করেন, তাঁর মৃত্যুও যেন সেই দিনেই হয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস ১৩৮৭) একইভাবে হযরত আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর জীবনের শেষ সময়ে বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেয়ে তাঁর কাছে অধিক প্রিয় ও সম্মানিত কেউ ছিলেন না। তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধার কারণে তিনি দীর্ঘসময় তাঁর দিকে চোখ তুলে তাকাতেও পারতেন না। (সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৯২)
উহুদের যুদ্ধের ময়দানেও সাহাবিদের নবীপ্রেম আত্মত্যাগের অসাধারণ রূপ ধারণ করেছিল। হযরত আবু তালহা রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে নিজের শরীরকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করছিলেন এবং বলছিলেন, “আমার বুক আপনার জন্য উৎসর্গিত।” (সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৮১১) একই যুদ্ধের আরেকটি হৃদয়স্পর্শী ঘটনা বর্ণিত হয়েছে এক নারী সাহাবির ব্যাপারে। তাঁর স্বামী ও ভাই শহীদ হওয়ার সংবাদ পাওয়ার পরও তাঁর প্রথম উদ্বেগ ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেমন আছেন। তাঁকে যখন বলা হলো যে নবীজী নিরাপদ আছেন, তখন তিনি তাঁকে নিজের চোখে দেখতে চাইলেন এবং তাঁকে দেখে বলেছিলেন—রাসূলুল্লাহ নিরাপদ থাকলে অন্য সব বিপদ তুচ্ছ। এই ঘটনাও সাহাবিদের হৃদয়ে নবীপ্রেমের গভীরতা তুলে ধরে।
তবে নবীপ্রেমের প্রকৃত শিক্ষা কেবল ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো স্মরণ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আধুনিক মুসলিম জীবনে এর বাস্তব প্রয়োগ আরও গুরুত্বপূর্ণ। একজন মুসলিম যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সত্যিকার অর্থে ভালোবাসেন, তাহলে তাঁর জীবনে সত্যবাদিতা, আমানতদারি, ন্যায়বিচার, বিনয়, ক্ষমাশীলতা, প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা, দরিদ্র ও দুর্বলদের প্রতি সহমর্মিতা এবং পরিবার-পরিজনের প্রতি উত্তম আচরণের প্রতিফলন ঘটবে। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন ছিল কুরআনের বাস্তব প্রয়োগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
আখিরাতেও নবীপ্রেমের গুরুত্ব অপরিসীম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “প্রত্যেক ব্যক্তি তার প্রিয় ব্যক্তির সঙ্গেই থাকবে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৬৪০) হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কিয়ামত কখন হবে। নবীজী তাঁকে পাল্টা জিজ্ঞেস করেন, তিনি কিয়ামতের জন্য কী প্রস্তুতি নিয়েছেন। লোকটি উত্তর দেন—আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ভালোবাসা। তখন নবীজী বলেন, “তুমি যাকে ভালোবাস, তার সঙ্গেই থাকবে।” আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ইসলামের পর এ কথার চেয়ে আনন্দদায়ক কোনো কথা তাঁরা শোনেননি। (সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৬৩৯)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মতের জন্য আখিরাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তেও শাফাআতের আশা রেখে গেছেন। তিনি বলেছেন, প্রত্যেক নবীকে একটি বিশেষ কবুলযোগ্য দুআ দেওয়া হয়েছিল এবং তিনি তাঁর সেই বিশেষ দুআ কিয়ামতের দিন উম্মতের শাফাআতের জন্য সংরক্ষণ করেছেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৯৯) ইমাম নববী রহমাতুল্লাহি আলাইহি এই হাদিসের ব্যাখ্যায় নবীজীর উম্মতের প্রতি পূর্ণ মায়া-মমতা ও তাঁদের কল্যাণের প্রতি গভীর মনোযোগের কথা উল্লেখ করেছেন।
আজকের বিশ্বে মুসলমানদের জন্য নবীপ্রেমের শিক্ষা তাই শুধু আবেগ, আলোচনা কিংবা স্মরণানুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। তাঁর প্রতি ভালোবাসাকে ব্যক্তিগত চরিত্র, পারিবারিক জীবন, সামাজিক আচরণ এবং নৈতিক সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত করা প্রয়োজন। তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ, তাঁর ওপর দরুদ ও সালাম পাঠ, তাঁর জীবনী অধ্যয়ন, তাঁর শিক্ষা সন্তানদের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং তাঁর মানবিক আদর্শকে নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করা—এসবই হতে পারে নবীপ্রেমের কার্যকর প্রকাশ।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন উম্মতের জন্য রহমত, হেদায়েতের পথপ্রদর্শক এবং কল্যাণের প্রতি আহ্বানকারী। তাঁর প্রতি ভালোবাসা একজন মুসলিমের ঈমানকে গভীর করে, চরিত্রকে সুন্দর করে এবং আল্লাহর আনুগত্যের পথে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে। সেই ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর প্রকাশ হলো—তাঁকে সম্মান করা, তাঁর ওপর দরুদ ও সালাম পাঠ করা, তাঁর সুন্নাহকে ভালোবাসা এবং তাঁর আদর্শকে জীবনের বাস্তবতায় অনুসরণ করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের অন্তরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সত্যিকারের মহব্বতে পূর্ণ করুন, তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ করার তাওফিক দান করুন এবং কিয়ামতের দিন তাঁর সঙ্গ লাভের সৌভাগ্য নসিব করুন। আমিন।
