মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ এবং হরমুজ প্রণালী ঘিরে সামুদ্রিক পরিবহনের ঝুঁকি বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো—পূর্ব-পশ্চিম অপরিশোধিত তেল পাইপলাইনের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা বিবেচনা করছে। বিষয়টির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ একাধিক সূত্র জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে আলোচিত এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে প্রতিদিন অতিরিক্ত প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবহনের সক্ষমতা যুক্ত হতে পারে, যা দেশটির মোট রপ্তানি সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করবে এবং হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনবে।
জানা গেছে, সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলের বৃহৎ তেলক্ষেত্র থেকে পশ্চিম উপকূলের লোহিত সাগর তীরবর্তী রপ্তানি টার্মিনাল পর্যন্ত বিস্তৃত পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন বহু বছর ধরেই দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। তবে সাম্প্রতিক আঞ্চলিক সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হওয়ার পর এই পাইপলাইনের কৌশলগত গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে গেছে। এখন সৌদি নীতিনির্ধারকরা এমন একটি অবকাঠামো গড়ে তুলতে চান, যা সংকটকালেও আন্তর্জাতিক বাজারে নিরবচ্ছিন্নভাবে তেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এই সম্প্রসারণ প্রকল্প কেবল সৌদি আরবের জন্য নয়, ভবিষ্যতে উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি প্রতিবেশী দেশের জন্যও বিকল্প রপ্তানি করিডোর হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। এ লক্ষ্যে সম্ভাব্য আন্তঃসীমান্ত সংযোগ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা নিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে কয়েকটি দেশের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেলেও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেনি।
জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের অপরিশোধিত তেল প্রতিদিন হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়। ফলে এই জলপথে যেকোনো সামরিক উত্তেজনা, অবরোধ বা নিরাপত্তা সংকট তাৎক্ষণিকভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলে এবং তেলের দামে অস্থিরতা সৃষ্টি করে। এমন পরিস্থিতিতে বিকল্প স্থলভিত্তিক পাইপলাইন অবকাঠামো শুধু সৌদি আরবের জন্য নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা বলয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পাইপলাইনটির সক্ষমতা বাড়ানো হলে লোহিত সাগরের বন্দর দিয়ে ইউরোপ, আফ্রিকা এবং বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে দ্রুত তেল রপ্তানির সুযোগ বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে সরবরাহের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সহজ হবে এবং সংকটময় সময়ে সমুদ্রপথের ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষ্য, এটি কেবল একটি অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি ভূরাজনীতির নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল। বিশ্ব জ্বালানি বাজারে সৌদি আরবের নেতৃত্ব ধরে রাখা, রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও স্থিতিশীল করা এবং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য আঞ্চলিক সংকট মোকাবিলায় প্রস্তুতি গ্রহণ—সব মিলিয়ে এই পরিকল্পনা দেশটির জ্বালানি নীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
যদিও প্রকল্পটির সময়সীমা, ব্যয় এবং চূড়ান্ত নকশা সম্পর্কে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা আসেনি, তবুও আন্তর্জাতিক জ্বালানি মহলে এটি ইতোমধ্যেই ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে শুধু সৌদি আরব নয়, পুরো বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় এর দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে এবং মধ্যপ্রাচ্যের অনিশ্চিত ভূরাজনৈতিক পরিবেশের মধ্যেও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি প্রবাহ আরও স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে।
বিশ্ব জ্বালানি নিরাপত্তায় নতুন কৌশল, লোহিত সাগরমুখী তেল পাইপলাইন বাড়াতে চায় সৌদি আরব
