মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান অস্থিরতার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, তিনি বর্তমানে ইরানের ‘এক নম্বর লক্ষ্যবস্তু’। তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলন শেষে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ইরানের বর্তমান নেতৃত্ব তাকে হত্যার চেষ্টা করছে এবং সে কারণেই তিনি দেশটির প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন। ট্রাম্পের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যত ভেঙে পড়েছে, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা আবারও বেড়েছে এবং দুই দেশের মধ্যে সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি শুধু দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককেই নয়, বরং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানে ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের বহু নেতা নিহত হয়েছেন এবং দেশটির ক্ষমতার কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। তিনি দাবি করেন, প্রথম সারির নেতৃত্ব আর নেই, দ্বিতীয় সারির নেতৃত্বও টিকে থাকতে পারেনি এবং বর্তমানে নতুন নেতৃত্ব দায়িত্ব পালন করছে। ট্রাম্পের ভাষায়, বর্তমান নেতৃত্ব আগের তুলনায় কিছুটা বেশি বাস্তববাদী হতে পারে, তবে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ তাকে সেই ধারণা নিয়ে সন্দিহান করে তুলেছে। তিনি আরও দাবি করেন, তিনিও হয়তো নিরাপদ নন, কারণ তার মতে তিনি এখন ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু।
ইরানের নেতৃত্ব সম্পর্কে ট্রাম্প কঠোর ভাষায় সমালোচনা করে বলেন, তারা দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী নীতি অনুসরণ করে আসছে। তার অভিযোগ, গত কয়েক দশক ধরে ইরানের শাসকগোষ্ঠী প্রতিশোধের রাজনীতি ও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের কৌশল অনুসরণ করেছে। তবে একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, যুদ্ধবিরতি নিয়ে অতীতের আলোচনায় অংশ নেওয়া কয়েকজন ইরানি প্রতিনিধিকে তিনি ইতিবাচক মনোভাবের মানুষ হিসেবে দেখেছেন। তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই কূটনৈতিক সম্ভাবনা অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে।
ট্রাম্পের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য হত্যাচেষ্টার বিষয়টি নতুন নয়। ২০২০ সালে ইরানের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা কাসেম সোলাইমানি নিহত হওয়ার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো ট্রাম্পসহ সাবেক প্রশাসনের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার নিরাপত্তা জোরদার করে। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ একাধিক মামলায় অভিযোগ করে, ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা প্রতিশোধমূলক হামলার পরিকল্পনায় জড়িত ছিলেন। তবে এসব অভিযোগ ইরান অতীতে অস্বীকার করেছে এবং সেগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হিসেবে পরিচিত এই প্রণালিতে যে কোনো সামরিক সংঘাত আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম, সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলতে পারে। এই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপ এবং কঠোর রাজনৈতিক বক্তব্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য কেবল ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ নয়; বরং এটি যুক্তরাষ্ট্র–ইরান বৈরিতার নতুন পর্যায়ের একটি রাজনৈতিক বার্তা। যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়া, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সক্রিয় ভূমিকা, সামরিক প্রস্তুতি বৃদ্ধি এবং পারস্পরিক কঠোর অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যকে আবারও একটি বিস্তৃত সংঘাতের ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ফলে আগামী দিনগুলোতে ওয়াশিংটন ও তেহরানের প্রতিটি পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক রাজনীতি, নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
নিকৃষ্ট’ ইরানিরা আমাকে খুন করতে চাইছে, আমি ওদের ১ নাম্বার টার্গেট: ট্রাম্প
