মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত ভূরাজনীতিতে ইতিহাস আবারও নতুন করে অস্ত্র হয়ে উঠেছে। ২০২৬ সালের শুরুতে দখলদার ই’সরাইল এমন একটি পদক্ষেপ নেয়, যা পুরো আরব বিশ্বে নীরব কিন্তু গভীর উদ্বেগ তৈরি করে। তারা প্রকাশ করে ৯২৮ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের একটি প্রাচীন রাজনৈতিক মানচিত্র, যেখানে বর্তমান ফিলিস্তিন, জর্ডান, সিরিয়া, লেবানন এবং সৌদি আরবের কিছু অংশকে প্রাচীন ইসরায়েলি রাজ্যের ভূখণ্ড হিসেবে দেখানো হয়। এই মানচিত্র প্রকাশের পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয় তীব্র আলোচনা, যদিও একই সময়ে ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা এবং গাজা যুদ্ধের কারণে বিষয়টি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বড়ভাবে আলোচিত হয়নি। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই মানচিত্র শুধুমাত্র ইতিহাসচর্চার অংশ নয়; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যে ভবিষ্যৎ ভূরাজনৈতিক বার্তা, মানসিক চাপ সৃষ্টি এবং ঐতিহাসিক বৈধতার নতুন এক কৌশল। ই’সরাইলের প্রকাশিত ওই মানচিত্রে কমলা রঙে দেখানো হয় উত্তর রাজ্য “ইসরায়েল”, যা বর্তমান ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর ও আশপাশের অঞ্চলের সঙ্গে মিলে যায়। সবুজ অংশকে দেখানো হয় “জুডাহ” বা “ইহুদা” রাজ্য হিসেবে, যার কেন্দ্র ছিল বর্তমান জেরুজালেম। এছাড়া মানচিত্রে সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চল, লেবাননের বিস্তীর্ণ এলাকা এবং জর্ডানের গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ডকেও প্রাচীন ইহুদি শাসনের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দেয় সৌদি সীমান্তঘেঁষা কিছু এলাকা, যেগুলো নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে “গ্রেটার ই’সরাইল” বিতর্ক নতুন করে সামনে আসে। মানচিত্রের সঙ্গে প্রকাশ করা হয় দুটি প্রাচীন মুদ্রার প্রতিচ্ছবি, যেখানে উল্লেখ ছিল “Jeroboam” এবং “Rehoboam” নামের দুই শাসকের। ঐতিহাসিকভাবে রাজা সোলায়মানের মৃত্যুর পর ৯২৮ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে প্রাচীন ইসরায়েলি রাজ্য বিভক্ত হয়ে যায় উত্তর “ইসরায়েল” ও দক্ষিণ “জুডাহ” রাজ্যে। এরপর শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিভিন্ন সাম্রাজ্যের হাতে অঞ্চলটির ক্ষমতা পরিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে—প্রায় তিন হাজার বছর পুরোনো একটি মানচিত্র কেন হঠাৎ ২০২৬ সালে প্রকাশ করা হলো? রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, এটি মূলত একটি কৌশলগত মনস্তাত্ত্বিক বার্তা। গাজায় সামরিক অভিযান, পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ এবং ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ই’সরাইল এখন নিজেদের “ঐতিহাসিক অধিকার” ধারণাকে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরতে চাইছে। তাদের দাবি, বর্তমান রাষ্ট্র কেবল আধুনিক রাজনৈতিক বাস্তবতা নয়, বরং হাজার বছরের পুরোনো এক জাতিগত ও ধর্মীয় উত্তরাধিকারের ধারাবাহিকতা। এই ন্যারেটিভের মাধ্যমে তারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার পাশাপাশি আরব বিশ্বকে মানসিকভাবে চাপে রাখতে চাইছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে “Promised Land” বা “প্রতিশ্রুত ভূমি” ধারণাকে কেন্দ্র করে উগ্র জায়নবাদী গোষ্ঠীগুলোর দীর্ঘদিনের বক্তব্য আবারও সামনে আসে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এই মানচিত্র প্রকাশের মধ্য দিয়ে “গ্রেটার ই’সরাইল” ধারণাকে ধীরে ধীরে জনমনে স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে। এই ধারণা অনুযায়ী, নীলনদ থেকে ফোরাত নদী পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলকে একসময় ইহুদিদের প্রতিশ্রুত ভূমি হিসেবে দেখা হতো। যদিও ই’সরাইল সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে সম্প্রসারণবাদী কোনো পরিকল্পনার কথা স্বীকার করে না, তবুও উগ্র জাতীয়তাবাদী ও ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর বক্তব্যে এই ধারণা বহুবার উঠে এসেছে। আরব বিশ্বে সবচেয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া আসে সৌদি আরব ও জর্ডানের পক্ষ থেকে। সৌদি পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষকরা এটিকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি বলে উল্লেখ করেন। জর্ডানও উদ্বেগ প্রকাশ করে জানায়, ইতিহাসকে ব্যবহার করে বর্তমান আন্তর্জাতিক সীমান্ত প্রশ্নবিদ্ধ করা হলে তা পুরো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তাকে অস্থিতিশীল করে তুলবে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় প্রতিটি ভূখণ্ডই কোনো না কোনো সাম্রাজ্যের ঐতিহাসিক অংশ ছিল। যদি অতীতের মানচিত্র দিয়ে বর্তমান ভূখণ্ড দাবি শুরু হয়, তাহলে পুরো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। বিশ্লেষকরা আরও বলছেন, এই মানচিত্র প্রকাশ এমন এক সময়ে করা হয়েছে যখন আরব বিশ্ব রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত এবং অর্থনৈতিকভাবে চাপে রয়েছে। গাজা ইস্যুতে মুসলিম বিশ্বের ঐক্য দুর্বল, সিরিয়া এখনও গৃহযুদ্ধের ক্ষত বহন করছে, লেবানন অর্থনৈতিক সংকটে বিপর্যস্ত এবং ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা প্রতিদিন নতুন মাত্রা পাচ্ছে। এই বাস্তবতায় ই’সরাইল হয়তো বুঝিয়ে দিতে চাইছে যে তারা কেবল বর্তমান যুদ্ধক্ষেত্রেই নয়, বরং ইতিহাস, ধর্ম ও ভূরাজনীতিকেও একসঙ্গে ব্যবহার করতে প্রস্তুত। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, এটি সরাসরি সামরিক আগ্রাসনের ঘোষণা না হলেও ভবিষ্যতের রাজনৈতিক অবস্থান তৈরির একটি “আইডিওলজিক্যাল প্রস্তুতি”। কারণ ইতিহাসভিত্তিক ভূখণ্ড দাবি সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ হয়, যা প্রথমে মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে প্রতিষ্ঠা করা হয়, পরে তা রাজনৈতিক ভাষ্য এবং শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক বাস্তবতায় রূপ নেয়। গাজা যুদ্ধের ভয়াবহতা, পশ্চিম তীরে উত্তেজনা, লোহিত সাগরে সামরিক সংঘাত এবং ইরান-ই’সরাইল মুখোমুখি অবস্থানের মধ্যেই এই মানচিত্র নতুন এক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। আরব বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে এখন শুধু সামরিক শক্তির লড়াই চলছে না; বরং ইতিহাস, ধর্ম, পরিচয় এবং মানসিক প্রভাবেরও এক জটিল যুদ্ধ শুরু হয়েছে। আর সেই যুদ্ধের নতুন অধ্যায়ে ৯২৮ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের একটি মানচিত্র হয়ে উঠেছে ২০২৬ সালের সবচেয়ে বিতর্কিত রাজনৈতিক প্রতীকের একটি।
