আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন একটি ঘোষণা দিয়েছেন, যা রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে ইউক্রেনের প্রতি পশ্চিমা সামরিক সহায়তার নীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর একটি হয়ে উঠতে পারে। তিনি জানান, কিয়েভকে শুধু বিদেশ থেকে প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহ করা নয়, বরং ইউক্রেনের নিজস্ব ভূখণ্ডে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উৎপাদনের লাইসেন্স দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষামূলক কৌশলের অংশ হিসেবে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে এই প্রযুক্তি তৈরি করার পদ্ধতি শেখাবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, প্যাট্রিয়ট সম্পূর্ণরূপে একটি প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্রব্যবস্থা, যার মূল উদ্দেশ্য ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা থেকে বেসামরিক জনগণ এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে সুরক্ষা দেওয়া।
এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে এটি একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কারণ এর মাধ্যমে ইউক্রেন বিশ্বের অন্যতম উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিজস্বভাবে উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদনে PAC-3 প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর উৎপাদনকারী বিশ্বের মাত্র চতুর্থ দেশে পরিণত হতে পারে। একই সঙ্গে এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ববর্তী নীতিরও একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে, কারণ অতীতে ওয়াশিংটন এ ধরনের সংবেদনশীল প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি বিদেশে স্থানান্তরের বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক ছিল।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেনে প্যাট্রিয়টের স্থানীয় উৎপাদন শুরু হলে পশ্চিমা দেশগুলোর অস্ত্রভাণ্ডারের ওপর নির্ভরতা কমবে, ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র দ্রুত পুনরায় উৎপাদন করা সম্ভব হবে, ইউক্রেনের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হবে এবং পূর্ব ইউরোপে ন্যাটোর সম্মিলিত নিরাপত্তা কাঠামোও আরও সুসংহত হবে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বহুবার বলেছেন, আধুনিক যুদ্ধে আকাশের নিয়ন্ত্রণই বিজয়ের অন্যতম প্রধান শর্ত। তাঁর মতে, কার্যকর আকাশ প্রতিরক্ষা ছাড়া শহর, বিদ্যুৎকেন্দ্র, জ্বালানি অবকাঠামো, সামরিক ঘাঁটি এবং সাধারণ নাগরিকদের ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা থেকে রক্ষা করা সম্ভব নয়।
এই ঘোষণার পেছনে আরও বিস্তৃত একটি কৌশলগত বাস্তবতা রয়েছে। কয়েক বছর ধরে ইউক্রেনকে বিপুল পরিমাণ সামরিক সহায়তা দেওয়ার ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদের ওপর চাপ বেড়েছে। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান–ইসরায়েল সংঘাতের কারণে উন্নত ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের চাহিদাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ইউক্রেনকে নিজস্বভাবে উৎপাদনের সুযোগ করে দেওয়া ওয়াশিংটনের জন্য এমন একটি সমাধান, যার মাধ্যমে কিয়েভের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদার করা সম্ভব হবে, অথচ যুক্তরাষ্ট্রকে অনির্দিষ্টকাল নিজের মজুদ থেকে অস্ত্র সরবরাহ করতে হবে না।
কিয়েভে রাশিয়ার সাম্প্রতিক বৃহৎ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পরপরই এই প্রস্তাব সামনে আসায় বিষয়টির কৌশলগত গুরুত্ব আরও বেড়েছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তি হস্তান্তর, শিল্প বিনিয়োগ এবং ন্যাটোর সমন্বয়ে এই লাইসেন্স কার্যকর হলে ইউক্রেন ধীরে ধীরে শুধু উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ব্যবহারকারী নয়, বরং নিজেই একটি উৎপাদনকারী রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে। এর ফলে দেশটি দীর্ঘমেয়াদে নিজের নিরাপত্তা চাহিদা পূরণে আরও আত্মনির্ভর হয়ে উঠবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এমন একটি পরিবর্তন শুধু ইউক্রেনের সামরিক সক্ষমতাই বাড়াবে না, বরং পূর্ব ইউরোপের ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যেও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। এটি রাশিয়ার আকাশ-প্রাধান্য কৌশলের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে, ইউক্রেন ও পশ্চিমা মিত্রদের মধ্যে প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা আরও গভীর করবে এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এমন এক নতুন যুগের সূচনা করবে, যেখানে কেবল অস্ত্র সহায়তা নয়, বরং প্রযুক্তি স্থানান্তর, প্রতিরক্ষা স্বনির্ভরতা এবং দেশীয় উৎপাদন ক্ষমতাই হবে ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কৌশলের প্রধান ভিত্তি।
মার্কিন কৌশলে বড় পরিবর্তন: অস্ত্র পাঠানোর বদলে উৎপাদনের প্রযুক্তি দেবে ওয়াশিংটন
