একেবারে সূচনাকালে এখানকার মানুষ কোন পথে হজে যেতেন সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় না; ধারণা করা হয় জাহাজ আবিষ্কারের আগে মানুষ পায়ে হেঁটে কিংবা উট-গাধার পিঠে চড়ে হজে যেতেন, তবে গণহারে হজযাত্রা শুরু হয় সমুদ্রপথে জাহাজের মাধ্যমেই—লিখিত ইতিহাসও তা-ই নির্দেশ করে। ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল দিয়ে স্থলপথ ছিল দীর্ঘ, কষ্টকর ও ঝুঁকিপূর্ণ, অন্যদিকে আরবরা ছিলেন দক্ষ ব্যবসায়ী; তারা পালতোলা জাহাজে সমুদ্রপথে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যাতায়াত করতেন এবং এশিয়ার পূর্বদিকে আসা-যাওয়ার পথে চট্টগ্রাম বন্দরে অবস্থান নিতেন, যেখান থেকে তারা অন্যান্য স্থানে যেতেন এবং পরবর্তীতে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যেও এখানে আসেন—তখন চট্টগ্রাম বন্দর ছিল এ অঞ্চলের অন্যতম প্রধান আন্তর্জাতিক বন্দর। তাই সে সময় এখান থেকে হজযাত্রা হয়নি—এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না; বরং ধারণা করা হয় সিন্ধু বিজয়ের (৬৬৪–৭১২ খ্রি.) আগেই এই যাত্রা শুরু হয়ে থাকতে পারে, যদিও লিখিত ইতিহাস মূলত মধ্যযুগীয়। ইতিহাসবিদ আবদুল হক চৌধুরীর ‘চট্টগ্রামের সমাজ ও সংস্কৃতির রূপরেখা’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে সুলতানি আমলে (১৩৪০–১৫৩৮ খ্রি.) বাংলাদেশসহ পূর্ব ভারতের হজযাত্রীরা চট্টগ্রাম বা সাতগাঁও বন্দর থেকে জাহাজে করে আরবের জেদ্দায় যেতেন, যার দূরত্ব ছিল প্রায় ৫,৬৩৩ নটিক্যাল মাইল। ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত ‘জার্নাল অব দ্য বিহার রিসার্চ সোসাইটি’-তেও সুলতানি আমলের হজযাত্রার প্রমাণ পাওয়া যায়, যেখানে হযরত মোজাফ্ফর শাহ বলখীর হজযাত্রার প্রসঙ্গ এবং সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের নির্দেশে চট্টগ্রাম থেকে জাহাজযোগে তাকে পাঠানোর ঘটনা উল্লেখ রয়েছে—যা প্রমাণ করে সে সময় হজযাত্রা যথেষ্ট সক্রিয় ছিল। মোগল আমলেও চট্টগ্রাম থেকে হজযাত্রা চললেও গুজরাটের সুরাট বন্দর বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, যা ‘বাব-আল মক্কা’ নামে পরিচিত ছিল; সম্রাট আকবর প্রথম সরকারি ভর্তুকিতে হজযাত্রার ব্যবস্থা করেন এবং ১৫৭৫ সালে পর্তুগিজদের সঙ্গে নিরাপত্তা চুক্তির পর নিয়মিত হজ নৌবহর পাঠানো শুরু হয়। যদিও মোগল সম্রাটরা নিজেরা হজে গেছেন এমন প্রমাণ নেই, তবে গুলবদন বেগম প্রথম রাজপরিবারের নারী হিসেবে হজে যান; আবার অনেক সময় নির্বাসনের শাস্তি হিসেবেও হজে পাঠানো হতো। ব্রিটিশ আমলে হজযাত্রার প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে বোম্বে (বর্তমান মুম্বাই) বন্দর, ফলে চট্টগ্রাম বন্দর গুরুত্ব হারায় এবং দূরদূরান্ত থেকে মানুষ বোম্বেতে গিয়ে জাহাজে উঠত—এই পুরো যাত্রায় সময় লাগত ৬–৭ মাস, এমনকি অতিরিক্ত আবেদনকারীর কারণে লটারির মাধ্যমে যাত্রী নির্বাচন করা হতো, যেখান থেকে ‘বোম্বাই হাজি’ কথাটির প্রচলন। জাহাজগুলো ছিল অস্বাস্থ্যকর ও অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই; ১৮৬৫ সালের দিকে ভারতীয় হাজিদের মাধ্যমে কলেরা ছড়িয়ে পড়ায় ব্রিটিশ সরকার জাহাজ ও কোয়ারেন্টাইনের ওপর আইনগত নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে, যদিও অনেক জাহাজমালিক মুনাফার আশায় তা অমান্য করতেন। ১৮৮৬–১৮৯৩ সাল পর্যন্ত টমাস কুক কোম্পানি সরকারি হজ এজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও পরে তা বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৩০-এর দশকে অধিকাংশ হজ জাহাজ মোগল লাইনের মালিকানায় ছিল এবং কলকাতা বন্দর দিয়ে হজযাত্রা শুরু করার উদ্যোগ নেন খান বাহাদুর বদি আহমদ চৌধুরী; ১৯৩৭ সালে ইংলিশতান জাহাজে করে কলকাতা থেকে হজযাত্রা শুরু হয়। দেশভাগের পর ১৯৪৮ সালে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে সরকারিভাবে হজযাত্রা চালু হয় এবং পাহাড়তলীতে স্থায়ী হাজি ক্যাম্প প্রতিষ্ঠা করা হয়, যেখানে যাত্রীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো; তখন ‘সাফিনা-ই-আরব’ ও ‘সফিনা-ই-আরাফাত’ নামে জাহাজে করে যাত্রা হতো এবং বছরে হাজার হাজার মানুষ হজে যেতেন। জেলাভিত্তিক কোটার ব্যবস্থা ছিল, অনেক সময় লটারির মাধ্যমে ডেক শ্রেণির যাত্রী নির্ধারণ করা হতো; দীর্ঘ যাত্রা, গরম আবহাওয়া ও ভিড়ের কারণে অসুস্থতা দেখা দিত, তাই চিকিৎসক ও নার্সও সঙ্গে থাকতেন। যাত্রাপথে খাদ্যসামগ্রী বহন করা হতো এবং ঝড়-তুফানের মধ্যে ভীতিকর অভিজ্ঞতার কথাও স্মৃতিচারণে পাওয়া যায়; এমনকি অনেক যাত্রী মৃত্যুবরণ করলে তাদের দাফন সম্ভব না হওয়ায় সমুদ্রে ভাসিয়ে দেওয়া হতো—এ বিষয়ে বিদেশি লেখকদের বিবরণও রয়েছে। হজযাত্রাকে জীবনের শেষ সফর মনে করে আত্মীয়-স্বজনদের ভিড়ে জেটি ভরে যেত, বিদায়ের মুহূর্ত ছিল আবেগঘন; জাহাজ ছাড়ার সময় কান্না, দোয়া ও শুভেচ্ছায় পরিবেশ ভারী হয়ে উঠত। ১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময় হজযাত্রীরা নানা সংকটে পড়েন এবং স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর উদ্যোগে তাদের দেশে ফেরার ব্যবস্থা করা হয়। স্বাধীনতার পর প্রথমদিকে সীমিত আকারে হজযাত্রা চললেও পরে বিমানযাত্রা চালু হলে সময় কমে আসে; ১৯৭৬/৭৭ সালে ‘হিজবুল বাহার’ জাহাজ চালু হলেও পরে তা বন্ধ হয়ে যায় এবং ১৯৮০-এর দশকে সমুদ্রপথে হজযাত্রা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। অবশেষে ১৯৮৯ সালে হজ কার্যক্রম স্থায়ীভাবে ঢাকার আশকোনা হাজি ক্যাম্পে স্থানান্তরিত হয়, যেখান থেকে বর্তমানে বাংলাদেশের হজ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে—একসময় চট্টগ্রামের পাহাড়তলীর হাজি ক্যাম্প ঘিরে যে ধর্মীয় আবেগ, উৎসবমুখর পরিবেশ ও ঐতিহ্য ছিল, তা এখন ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে।
