রাজধানী ঢাকার পার্শ্ববর্তী সাভারে আবাসিক একটি মাদরাসার সাত বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীকে দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় মাদরাসাটির চার শিক্ষক ও ছয় শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। শিশুটির পরিবারের অভিযোগ, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাইয়ের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে মাদরাসার কয়েকজন শিক্ষক ও শিক্ষার্থী তাকে যৌন নির্যাতন করেছে। আদালতের নির্দেশের পর গত ২৬ আগস্ট সাভার মডেল থানায় মামলাটি নথিভুক্ত করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে এবং অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
শিশুটির বাবা জানান, তার ছেলে সাভারের পূর্ব শাহীবাগ এলাকায় অবস্থিত মারকাযুল উলুম আশ-শরইয়্যাহ মাদরাসায় পড়াশোনা করত এবং আবাসিক শিক্ষার্থী হিসেবে সেখানেই থাকত। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, কিছুদিন ধরে বাড়িতে আসার পর শিশুটির আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। সে মনমরা থাকত, স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে চাইত না, খাবারের প্রতিও অনীহা দেখাত এবং মাদরাসায় ফিরে যেতে চাইত না। শুরুতে পরিবার বিষয়টিকে পড়াশোনার চাপ কিংবা মাদরাসার পরিবেশজনিত সাধারণ সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করায় ঘটনাটির প্রকৃত কারণ তাদের নজরে আসেনি।
পরিবারের দাবি, পরে অন্য এক শিক্ষার্থীর অভিভাবকের কাছ থেকে তারা জানতে পারেন যে ওই মাদরাসায় শিশু শিক্ষার্থীদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে অভ্যন্তরীণভাবে আলোচনা ও বিচার হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বিষয়টি জানার পর শিশুটিকে মাদরাসা থেকে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১৪ আগস্ট শিশুটি তাদের কাছে নির্যাতনের কথা প্রকাশ করে এবং জানায় যে বিভিন্ন সময়ে মাদরাসার কয়েকজন শিক্ষক ও শিক্ষার্থী তাকে যৌন নির্যাতনের শিকার করেছে।
শিশুটির বাবার অভিযোগ, ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে ৬ জুলাইয়ের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে এসব ঘটনা ঘটেছে। অভিযোগ জানাতে তিনি মাদরাসার পরিচালক জিয়া বিন কাশেমের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তার দাবি, অভিযুক্ত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের পুলিশের কাছে হস্তান্তরের আশ্বাস দেওয়া হলেও পরদিন কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং বিষয়টি নিয়ে নীরব থাকার জন্য তাকে চাপ ও হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি। এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে শিশুটির শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে পরিবার পরিচিত এক চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়। চিকিৎসক শিশুটিকে দ্রুত সরকারি হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। গত ১৮ আগস্ট তাকে সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) পাঠানোর পরামর্শ দেন। একই দিন শিশুটিকে ঢাকায় নেওয়া হয় এবং পরিবারের দাবি অনুযায়ী, সেখানে চারদিন ভর্তি রেখে তার চিকিৎসা দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে একজন আইনজীবীর সহায়তায় শিশুটির পরিবার আদালতের দ্বারস্থ হয়। আদালত শিশুটির জবানবন্দি গ্রহণের পর সাভার মডেল থানাকে মামলা গ্রহণের নির্দেশ দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২৬ আগস্ট থানায় মামলাটি নথিভুক্ত হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সাভার মডেল থানার উপপরিদর্শক মো. সামিরুল হাসান জানান, শিশুটিকে যৌন নির্যাতন এবং এতে সহায়তার অভিযোগে মোট ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তাদের মধ্যে ছয়জন শিক্ষার্থী ও চারজন শিক্ষক। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, পাঁচ শিক্ষার্থী ও একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে সরাসরি যৌন নির্যাতনের অভিযোগ আনা হয়েছে এবং অন্য চারজনের বিরুদ্ধে নির্যাতনে সহায়তার অভিযোগ রয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, আদালতের নির্দেশে মামলাটি হওয়ায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে এবং অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে।
সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. সাইফুল আলম বলেন, অভিযোগকারী চাইলে সরাসরি থানায় মামলা করতে পারতেন এবং সে ক্ষেত্রে অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তারের সুযোগ তৈরি হতে পারত। তবে মামলা হওয়ার আগেই অভিযুক্তরা আত্মগোপনে চলে গেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
ঘটনাটি বাংলাদেশের আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিরাপত্তা, তদারকি ও অভিযোগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু যৌন নির্যাতনের অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সালিশ বা সমঝোতার পরিবর্তে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, চিকিৎসা কর্তৃপক্ষ ও শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করা জরুরি। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত, শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় শিশুটির মানসিক ও শারীরিক সুরক্ষা অগ্রাধিকার পাওয়া প্রয়োজন।
মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন। অভিযুক্ত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়নি এবং তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের দোষী হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। শিশুটির পরিচয় ও ব্যক্তিগত তথ্য তার সুরক্ষা ও গোপনীয়তার স্বার্থে প্রকাশ করা হচ্ছে না।
