সিরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের শাসনামলে দেইর আজ-জোরে নির্মিত একটি অঘোষিত পরমাণু স্থাপনা সম্ভাব্য পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কাজে ব্যবহারের উপযোগী ছিল বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)। জাতিসংঘের পরমাণু পর্যবেক্ষক সংস্থার মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসি সোমবার ভিয়েনায় সাংবাদিকদের বলেন, স্থাপনাটিতে এমন একটি চুল্লি নির্মাণ করা হয়েছিল, যেখানে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় বিভাজ্য পদার্থ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকার সম্ভাবনা ছিল। আইএইএর নতুন এই মূল্যায়ন সিরিয়ার সাবেক সরকারের গোপন পরমাণু কর্মকাণ্ড নিয়ে দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক উদ্বেগকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে। আইএইএ বর্তমানে সিরিয়ার নতুন সরকারের সহযোগিতায় ওই স্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পরমাণু কর্মকাণ্ডের বিষয়ে তদন্ত ও যাচাই কার্যক্রম চালাচ্ছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, আগস্টে তাদের একটি দল দেইর আজ-জোরসহ সিরিয়ার কয়েকটি স্থাপনা পরিদর্শন করে। পরিদর্শনের সময় মাটির নিচে পাওয়া একটি শীতলীকরণ অবকাঠামো এমন বৈশিষ্ট্য দেখিয়েছে, যা একটি পরমাণু চুল্লির অবকাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আইএইএ বলছে, স্থাপনাটির খনন ও তদন্ত কার্যক্রম আরও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ অব্যাহত থাকবে। গ্রসির বর্ণনা অনুযায়ী, পরিদর্শকদের স্থাপনার ভেতরে পৌঁছাতে দেয়াল ভাঙতে হয়েছে এবং লুকিয়ে রাখা পরমাণু উপাদানে পৌঁছানোর জন্য তাদের একটি অত্যন্ত সরু ও কঠিন পথ অতিক্রম করতে হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন ধরনের বাক্স ও সামগ্রী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ পরমাণু উপাদানগুলো বর্তমানে আইএইএর নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় রয়েছে। সংস্থাটি ওই এলাকায় নজরদারি ক্যামেরাও স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে। আইএইএর অনুসন্ধানে শুধু দেইর আজ-জোরের চুল্লির তথ্যই নয়, বরং সংশ্লিষ্ট আরও কয়েকটি স্থাপনার অস্তিত্বের বিষয়ও উঠে এসেছে। সংস্থার মতে, একটি স্থাপনায় ওই চুল্লির জন্য পরমাণু জ্বালানি উৎপাদনের কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে থাকতে পারে। পাশাপাশি পারমাণবিক জ্বালানি, ইউরেনিয়াম-সম্পর্কিত বর্জ্য এবং অন্যান্য তেজস্ক্রিয় বর্জ্য সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত একটি গুদামের তথ্যও পাওয়া গেছে। আইএইএ আরও জানিয়েছে, সাবেক সিরীয় কর্তৃপক্ষ এসব পরমাণু উপাদান, স্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম সম্পর্কে সংস্থাটিকে প্রয়োজনীয় তথ্য দেয়নি। ফলে সিরিয়ার ঘোষণাবহির্ভূত পরমাণু কর্মকাণ্ডের প্রকৃতি ও উদ্দেশ্য নির্ধারণে আন্তর্জাতিক তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দেইর আজ-জোরের স্থাপনাটি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ প্রথম বড় আকারে প্রকাশ্যে আসে ২০০৭ সালে, যখন ইসরায়েলি বিমান হামলায় স্থাপনাটি ধ্বংস করা হয়। পরবর্তী সময়ে সিরীয় কর্তৃপক্ষ এলাকাটি মাটির সঙ্গে সমান করে দেয়। তবে স্থাপনাটি কী উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়েছিল এবং সেখানে কী ধরনের পরমাণু কার্যক্রম চলছিল—এ বিষয়ে আইএইএর প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ জবাব সে সময়ের সিরীয় সরকার দেয়নি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে দীর্ঘদিন ধরে দাবি করা হয়েছে, আসাদ সরকারের সময় সিরিয়া উত্তর কোরিয়ার সহায়তায় একটি গোপন পরমাণু কর্মসূচি পরিচালনা করেছিল। তবে দামেস্ক এ ধরনের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে সিরিয়ার নতুন প্রশাসন আইএইএর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়িয়েছে। গত জুলাইয়ে নতুন সিরীয় কর্তৃপক্ষ আরও একটি অঘোষিত স্থাপনার অস্তিত্ব সম্পর্কে আইএইএকে অবহিত করে এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু পরিদর্শকদের সেখানে তদন্তের অনুমতি দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে আইএইএর একটি দল গত মাসে ওই স্থাপনাটিও পরিদর্শন করেছে। সংস্থাটি এখন সিরিয়ার বিভিন্ন স্থাপনা, পরমাণু উপাদান ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর প্রকৃতি নির্ধারণের পাশাপাশি সেগুলোর অতীত ব্যবহারের বিষয়ে আরও তথ্য সংগ্রহ করছে। বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, সিরিয়ার অঘোষিত পরমাণু কর্মকাণ্ডের বিষয়ে আইএইএর নতুন অনুসন্ধান মধ্যপ্রাচ্যের পারমাণবিক বিস্তার নিয়ে বিদ্যমান উদ্বেগকে নতুন করে সামনে আনতে পারে। একই সঙ্গে অঞ্চলটির অন্যান্য রাষ্ট্রের পারমাণবিক সক্ষমতা ও অঘোষিত কর্মসূচি নিয়েও আন্তর্জাতিক বিতর্ক তীব্র হতে পারে। ইসরায়েলকে দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করা হলেও দেশটি কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক অস্ত্র থাকার কথা স্বীকার বা অস্বীকার করেনি। ফলে সিরিয়ার সাবেক সরকারের গোপন পরমাণু কর্মকাণ্ডের বিষয়ে আইএইএর নতুন তথ্য মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার, আন্তর্জাতিক পরমাণু নিরাপত্তা এবং সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর দায়বদ্ধতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। আইএইএর তদন্ত আরও এগিয়ে গেলে দেইর আজ-জোরের স্থাপনার প্রকৃত উদ্দেশ্য, সেখানে উৎপাদিত বা সংরক্ষিত পরমাণু উপাদানের ধরন এবং সাবেক সিরীয় সরকারের পরমাণু কর্মসূচির পরিধি সম্পর্কে আরও স্পষ্ট তথ্য সামনে আসতে পারে।
