জাতিসংঘের পরমাণু পর্যবেক্ষণ সংস্থা জানিয়েছে, সিরিয়ার সাবেক সরকারের আমলে পরিচালিত গোপন পারমাণবিক কর্মকাণ্ড নিয়ে দীর্ঘদিনের তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। সিরিয়ার বর্তমান কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় তথ্য ও স্থাপনাগুলোতে প্রবেশের সুযোগ দেওয়ায় সংস্থাটি দেশটির অতীত পারমাণবিক কর্মকাণ্ড ও মজুত করা পারমাণবিক উপকরণ নিয়ে তাদের অমীমাংসিত প্রশ্নগুলোর সমাধান করতে সক্ষম হয়েছে। তবে একই সময়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। ২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরানের ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে আন্তর্জাতিক পরমাণু পরিদর্শকদের প্রবেশাধিকার এখনো পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে দেশটিতে থাকা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের প্রকৃত পরিমাণ, অবস্থান ও বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে সংস্থাটির কাছে পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই। সদস্যরাষ্ট্রগুলোর কাছে পাঠানো সাম্প্রতিক গোপনীয় প্রতিবেদনে সংস্থাটি সিরিয়ার বর্তমান কর্তৃপক্ষের “স্বচ্ছতা ও সহযোগিতার” প্রশংসা করেছে। ২০২৪ সালের শেষ দিকে বাশার আল-আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সিরিয়ার নতুন কর্তৃপক্ষ আন্তর্জাতিক পরমাণু পর্যবেক্ষণ সংস্থার সঙ্গে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেয়। সেই সহযোগিতার ফলে তদন্তকারীরা সিরিয়ার সাবেক শাসনামলের গোপন পারমাণবিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম হন। সংস্থাটি নিশ্চিত করেছে যে, ২০০৭ সালে ইসরায়েল সিরিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় দেইর আল-জোর এলাকায় যে অঘোষিত স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিল, সেটি একটি পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণের জন্য তৈরি করা হচ্ছিল। তদন্তে আরও জানা গেছে, সংশ্লিষ্ট একটি স্থানে প্রায় ৭৩ মেট্রিক টন প্রাকৃতিক ইউরেনিয়াম ধাতু মজুত ছিল। এর মধ্যে প্রায় ৫৫ মেট্রিক টন ছিল জ্বালানি দণ্ডের আকারে। ওই চুল্লির জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানিও সিরিয়ার অভ্যন্তরেই প্রস্তুত করা হয়েছিল। বর্তমানে এসব পারমাণবিক উপকরণ আন্তর্জাতিক পরমাণু সংস্থার নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারির আওতায় রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিরিয়ার সাবেক কর্তৃপক্ষ পারমাণবিক উপকরণ, স্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় তথ্য জানায়নি। নির্মাণাধীন পারমাণবিক চুল্লি, জ্বালানি তৈরির স্থাপনা এবং জ্বালানি সংরক্ষণের স্থান—সবই যথাযথভাবে ঘোষণা করা হয়নি। তবে বর্তমান সিরীয় কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় পারমাণবিক উপকরণের হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোর নকশা ও অন্যান্য তথ্য সরবরাহ করে পরিস্থিতি সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। ইরানের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। আন্তর্জাতিক পরমাণু সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে তদন্তে আবারও কোনো অগ্রগতি হয়নি। ২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরানের যেসব পারমাণবিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, সেখানে আন্তর্জাতিক পরমাণু পরিদর্শকরা এখনো ফিরে যেতে পারেননি। হামলার আগে ইরানের কাছে প্রায় ৪৪০ দশমিক ৯ কেজি ইউরেনিয়াম ছিল, যা সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা হয়েছিল। অস্ত্র তৈরির উপযোগী মাত্রা সাধারণত প্রায় ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধতার কাছাকাছি বলে বিবেচিত হয়। আন্তর্জাতিক পরমাণু সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ইরানের ওই পরিমাণ ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আরও সমৃদ্ধ করা হলে তা তাত্ত্বিকভাবে প্রায় ১০টি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উপযোগী উপকরণে পরিণত হতে পারে। তবে হামলার পর ওই ইউরেনিয়ামের কতটা অবশিষ্ট রয়েছে, কোথায় রয়েছে এবং বর্তমানে তার কী অবস্থা—তা নিশ্চিতভাবে জানা যাচ্ছে না। সংস্থাটি জানিয়েছে, এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ইরানের ঘোষিত পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে থাকা স্বল্পমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম এবং ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত সম্পর্কে ধারাবাহিকভাবে তথ্য যাচাই করার সক্ষমতা তাদের নেই। পারমাণবিক উপকরণগুলোর অবস্থান সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্যের অভাব এবং সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোতে প্রবেশ করে সেগুলো যাচাই করতে না পারাকে সংস্থাটি আন্তর্জাতিকভাবে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের ক্ষেত্রে গুরুতর উদ্বেগ হিসেবে উল্লেখ করেছে। সংস্থাটি বিষয়টির দ্রুত সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের পারমাণবিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে একদিকে সিরিয়ার সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরমাণু পর্যবেক্ষকদের সহযোগিতার কারণে দীর্ঘদিনের তদন্তে অগ্রগতি দেখা গেলেও অন্যদিকে ইরানের ক্ষেত্রে পরিদর্শন ও যাচাইয়ের সুযোগ না থাকায় আন্তর্জাতিক উদ্বেগ আরও গভীর হচ্ছে। আগামী বৈঠকে ইরানের পারমাণবিক উপকরণের অবস্থান, আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের প্রবেশাধিকার এবং ভবিষ্যতে পরমাণু কার্যক্রম যাচাইয়ের ব্যবস্থা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনা ও সংঘাতের মধ্যে ইরানের পারমাণবিক উপকরণ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্যের ঘাটতি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য নতুন করে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।
