আফ্রিকার স্বর্ণসম্পদের ইতিহাসে ১৪শ শতকের মালি সাম্রাজ্যের সম্রাট মানসা মুসার নাম আজও কিংবদন্তি হিসেবে উচ্চারিত হয়। বিশ্বের ইতিহাসে সর্বাধিক ধনী ব্যক্তিদের একজন হিসেবে পরিচিত এই শাসকের বিপুল সম্পদের প্রধান উৎস ছিল তাঁর সাম্রাজ্যের অপরিসীম স্বর্ণভাণ্ডার। তবে শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও আফ্রিকার সঙ্গে স্বর্ণের সম্পর্ক এখনো এক গভীর বৈপরীত্যের প্রতীক। একদিকে মহাদেশটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ স্বর্ণসম্পদের অধিকারী, অন্যদিকে এই সম্পদ থেকে সৃষ্ট বিপুল অর্থনৈতিক সুবিধার বড় অংশই বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানি, আন্তর্জাতিক বাজার এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের মাধ্যমে আফ্রিকার বাইরে চলে যাচ্ছে। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP)-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের মোট স্বর্ণের মজুদের প্রায় ৪০ শতাংশ আফ্রিকায় অবস্থিত। দক্ষিণ আফ্রিকা, ঘানা, মালি, তানজানিয়া, বুরকিনা ফাসো, সুদান ও কঙ্গোসহ একাধিক দেশ বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ স্বর্ণ উৎপাদনকারী রাষ্ট্র হলেও খনিজ সম্পদের প্রকৃত আর্থিক সুফল সাধারণ মানুষের জীবনে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আনতে পারেনি। বিশ্লেষকদের মতে, দুর্বল শাসনব্যবস্থা, অবৈধ স্বর্ণ পাচার, কর ফাঁকি, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আধিপত্য, অপর্যাপ্ত শিল্পায়ন এবং মূল্য সংযোজনকারী প্রক্রিয়ার অভাবে আফ্রিকার বিপুল স্বর্ণসম্পদের প্রকৃত মূল্য মহাদেশের বাইরে স্থানান্তরিত হচ্ছে। ফলে প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও অনেক আফ্রিকান দেশ দারিদ্র্য, বেকারত্ব এবং অবকাঠামোগত সংকটের সঙ্গে লড়াই করছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি আফ্রিকার দেশগুলো স্বর্ণ উত্তোলনের পাশাপাশি পরিশোধন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, গহনা উৎপাদন এবং রপ্তানির পূর্ণ মূল্যশৃঙ্খল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে, তবে এই শিল্প মহাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে। মানসা মুসার যুগের ঐতিহাসিক ঐশ্বর্য আজও আফ্রিকার সম্ভাবনার প্রতীক হয়ে আছে, তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তব সমৃদ্ধিতে রূপ দিতে হলে সম্পদের ন্যায্য বণ্টন, সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
