মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত নতুন এক নাটকীয় মোড়ে পৌঁছেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালীকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করার কথা বলেছেন; কিন্তু আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন ও হরমুজের ভৌগোলিক বাস্তবতায় এমন একতরফা ঘোষণা নিজে থেকেই কোনো জলসীমার সার্বভৌমত্ব বদলে দিতে পারে না। ইরানও স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, হরমুজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তারা পিছিয়ে যাবে না। ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ এখন পরিণত হয়েছে ওয়াশিংটন ও তেহরানের শক্তি, সার্বভৌমত্ব ও কৌশলগত প্রভাবের সরাসরি পরীক্ষাক্ষেত্রে।
উত্তেজনা আরও বেড়েছে ইরানের সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল আমির হাতামির ঘোষণায়—কোনো মার্কিন সেনাসদস্যকে হত্যা বা আটক করতে পারলে ৩০ হাজার ডলার পুরস্কার দেওয়া হবে বলে ইরানি সূত্রে দাবি করা হয়েছে। এই বক্তব্য সংঘাতকে কেবল কূটনৈতিক বাকযুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির বিরুদ্ধেও কঠোর বার্তা দিয়েছে। একই সময়ে ইরান ও কাতারের মধ্যে নিখোঁজ ইরানি পাইলটদের ভাগ্য নিয়ে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে; তেহরান তদন্ত চাইলেও দোহা ইরানের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, তারা একজন পাইলটের মরদেহ উদ্ধার করেছে এবং ইরানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছে। ফলে যুদ্ধের অভিঘাত এখন ইরান–যুক্তরাষ্ট্র দ্বন্দ্বের বাইরে গিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোকেও আরও গভীরভাবে প্রভাবিত করছে।
অন্যদিকে ওয়াশিংটন গাজা নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতাও চালিয়ে যাচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের দূত জ্যারেড কুশনার কায়রোতে মিসর, কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং হামাস নেতা খলিল আল-হাইয়ার সঙ্গেও আলোচনা করেছেন। প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং গাজা থেকে ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহারের বিষয় রয়েছে; কিন্তু ইসরায়েল হামাসের সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ ছাড়া প্রত্যাহারে অনাগ্রহী। একই সময়ে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১১ জন নিহত হওয়ার খবর এসেছে। অর্থাৎ একদিকে যুক্তরাষ্ট্র শান্তির আলোচনা এগিয়ে নিতে চাইছে, অন্যদিকে অঞ্চলজুড়ে সামরিক অভিযান ও উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে।
হরমুজ সংকটের অর্থনৈতিক প্রভাবও স্পষ্ট হচ্ছে। ১৬ আগস্ট পর্যন্ত প্রণালী দিয়ে ট্যাংকার চলাচল বাধাগ্রস্ত থাকার খবর এসেছে, আর জ্বালানি বাজারে উদ্বেগ বেড়েছে। এর অর্থ, সংঘাতের প্রভাব এখন যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে তেল, শিপিং, বীমা ব্যয় ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়ছে। হরমুজ দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ তেল ও জ্বালানি পরিবহন হওয়ায় দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন আর কে বেশি ক্ষেপণাস্ত্র, যুদ্ধবিমান বা বিমানবাহী রণতরী রাখে—তা নয়; বরং কে কতদিন এই চাপ ধরে রাখতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র কতদিন বিপুল সামরিক ও নৌসম্পদ মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন রাখবে, ইরান কতদিন অর্থনৈতিক চাপ সহ্য করবে, বিশ্ববাজার কতদিন সীমিত নৌচলাচল সামলাবে এবং মিত্ররা কতদিন একই কৌশলের পাশে থাকবে—এসবই এখন সংঘাতের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সামরিক শক্তি শুধু অস্ত্রের সংখ্যা নয়; এটি সরবরাহব্যবস্থা, অর্থনীতি, জনবল, রাজনৈতিক সমর্থন এবং দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতারও পরীক্ষা।
হরমুজ তাই এখন আর কেবল একটি প্রণালী নয়; এটি আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ এবং যুক্তরাষ্ট্র–ইরান শক্তির দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দু। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি কে সবচেয়ে বড় ঘোষণা দিল, তা নয়—কে সেই ঘোষণাকে বাস্তব নিয়ন্ত্রণে পরিণত করতে পারবে এবং তার রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক মূল্য কতটা বহন করতে পারবে। হরমুজের জলপথে সেই পরীক্ষাই এখন চলছে, আর এর ফলাফল শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্য এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
