মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা প্রশমনে নতুন একটি কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছে ওমান। উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সমর্থনে প্রস্তুত করা একটি প্রস্তাব ইতোমধ্যে ইরানের কাছে উপস্থাপন করেছে মাসকাট। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের কাছ থেকে বাধ্যতামূলক টোল নয়, বরং স্বেচ্ছা আর্থিক অবদান গ্রহণের একটি ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ইরানের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অবাধ নৌ-চলাচলের দাবির মধ্যে একটি সমঝোতার ভিত্তি তৈরি হতে পারে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথগুলোর একটি। বৈশ্বিক তেল রপ্তানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই প্রণালিতে যে কোনো ধরনের অস্থিরতা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারেও তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনার কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে ব্যাপক ওঠানামা দেখা দেয়। যুদ্ধবিরতির কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও নৌ-চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে মতপার্থক্য অব্যাহত রয়েছে।
ওমানের প্রস্তাব অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনায় ইরান একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করবে না। বরং ওমানের সঙ্গে সমন্বয়ের ভিত্তিতে একটি যৌথ কাঠামোর মাধ্যমে নৌ-চলাচল তদারকি করা হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জাহাজগুলো চাইলে স্বেচ্ছায় আর্থিক অবদান রাখতে পারবে। এই অর্থ নৌপথের নিরাপত্তা, নাব্যতা রক্ষা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রমে ব্যয় করা হবে।
কূটনৈতিক সূত্র বলছে, প্রস্তাবটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মালাক্কা প্রণালিতে চালু থাকা স্বেচ্ছা অবদানভিত্তিক ব্যবস্থার আদলে তৈরি করা হয়েছে। সেখানে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর আন্তর্জাতিক জাহাজ থেকে বাধ্যতামূলক ফি নেয় না; বরং স্বেচ্ছা অনুদানের মাধ্যমে নৌপথের নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় নির্বাহ করে।
গত সপ্তাহান্তে ওমানের কর্মকর্তারা তেহরান সফর করে ইরানি নেতাদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করেন। তবে সোমবার পর্যন্ত ইরানের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো জবাব দেওয়া হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। তেহরান দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে উপকূলবর্তী রাষ্ট্র হিসেবে তাদের বৈধ ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে এবং এই দায়িত্ব আঞ্চলিক দেশগুলোর মাধ্যমেই পরিচালিত হওয়া উচিত।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ওমান ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে পৃথক বৈঠকে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেছেন। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতে, বৈঠকে আঞ্চলিক সমন্বয় জোরদার এবং উত্তেজনা হ্রাসের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানকে ঘিরে আলোচনা ইতিবাচক অগ্রগতি দেখাচ্ছে। তবে আলোচনায় কাঙ্ক্ষিত ফল না এলে যুক্তরাষ্ট্র আবারও সামরিক অভিযান শুরু করতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেছেন। ট্রাম্পের এই মন্তব্য নতুন করে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পাশাপাশি সামরিক বিকল্পও খোলা রয়েছে—এমন বার্তা দিচ্ছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
তবে ইরান নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছে। তেহরানের অভিযোগ, পূর্ববর্তী সমঝোতার শর্ত বাস্তবায়নে ওয়াশিংটন নিজেই ব্যর্থ হয়েছে এবং হরমুজ প্রণালির বিষয়ে দুই পক্ষের ব্যাখ্যার মধ্যে এখনো মৌলিক পার্থক্য রয়ে গেছে।
এদিকে ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বৈঠক ঘিরেও আন্তর্জাতিক মহলের নজর রয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, এই বৈঠকে ইরান, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, যুদ্ধ-পরবর্তী কূটনৈতিক প্রক্রিয়া এবং হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ওমানের এই উদ্যোগ সফল হলে তা শুধু হরমুজ প্রণালিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনবে না, বরং মধ্যপ্রাচ্যে নতুন একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গঠনের পথও উন্মুক্ত করতে পারে। তবে সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য ইরান, উপসাগরীয় দেশগুলো, যুক্তরাষ্ট্র এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক অংশীদারদের মধ্যে আস্থা ও সমঝোতা গড়ে তোলা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই নির্ভর করছে চলমান কূটনৈতিক তৎপরতা, আঞ্চলিক রাজনৈতিক সমঝোতা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর।
হরমুজ সংকট নিরসনে ওমানের নতুন উদ্যোগ, ইরানের কাছে উপসাগরীয়
