গাজায় যুদ্ধের অবসান, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের প্রস্তাবিত ১৫ দফা রোডম্যাপকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। রোববার ইসরায়েলি মন্ত্রিসভার বৈঠকে নেতানিয়াহু স্পষ্ট করে বলেন, হামাসকে “প্রকৃত অর্থে নিরস্ত্রীকরণ” না করা পর্যন্ত গাজা থেকে ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহার করা হবে না। তাঁর এই অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধবিরতি ও পুনর্গঠন উদ্যোগকে নতুন করে সংকটে ফেলেছে এবং ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মধ্যে নীতিগত মতপার্থক্য আরও প্রকাশ্য করে তুলেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের পরিকল্পনায় হামাস ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর অস্ত্র সমর্পণের বিনিময়ে ধাপে ধাপে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার, গাজার প্রশাসনিক কাঠামোয় পরিবর্তন, একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি জাতীয় কমিটির মাধ্যমে বেসামরিক শাসন এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। পরিকল্পনাটির মূল লক্ষ্য ছিল একই সঙ্গে নিরাপত্তা, নিরস্ত্রীকরণ, ইসরায়েলি প্রত্যাহার এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার পুনর্গঠনের জন্য একটি পর্যায়ক্রমিক কাঠামো তৈরি করা। তবে পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার আগে হবে, নাকি হামাসের সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ আগে নিশ্চিত করা হবে—এ বিষয়েই এখন সবচেয়ে বড় বিরোধ দেখা দিয়েছে। গত ৩০ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ‘বোর্ড অব পিস’ গাজার জন্য ১৫ দফা একটি বাস্তবায়ন কাঠামো সামনে আনে। এতে হামাসকে অস্ত্র ত্যাগের বিনিময়ে পূর্ণাঙ্গ ইসরায়েলি সামরিক প্রত্যাহারের পথ তৈরি করার কথা বলা হয় এবং গাজার ভবিষ্যৎ শাসনভার একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি জাতীয় কমিটির হাতে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়, যার নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক বাহিনী ভূমিকা রাখবে। ট্রাম্প এর আগে জানিয়েছিলেন, এই চুক্তি ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হবে এবং হামাসের নিরস্ত্রীকরণ যত এগোবে, ইসরায়েলি বাহিনীও ততটাই গাজা থেকে সরে যাবে। কিন্তু নেতানিয়াহুর বক্তব্যে সেই সমঝোতার মৌলিক ভারসাম্যই প্রশ্নের মুখে পড়েছে। তিনি বলেন, ইসরায়েল কোনো “কাল্পনিক” বা অসম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ মেনে নেবে না এবং হামাসের হাতে কোনো অস্ত্র অবশিষ্ট থাকা অবস্থায় ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার করা হবে না। নেতানিয়াহু আরও জানান, ওয়াশিংটনের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা চলছে এবং পরিকল্পনার কিছু অংশ ইসরায়েলের কাছে গ্রহণযোগ্য হলেও কিছু প্রস্তাব তারা মেনে নিতে পারছে না। তাঁর ভাষায়, ইসরায়েল নিজেদের অবস্থানে অটল থাকবে। বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর এই কঠোর অবস্থানের পেছনে শুধু সামরিক ও নিরাপত্তাগত হিসাব নয়, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। চলতি বছরের ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা এবং সাম্প্রতিক বিভিন্ন জনমত জরিপে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থান চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ফলে তাঁর ডানপন্থী রাজনৈতিক ভিত্তিকে সন্তুষ্ট রাখা এবং হামাসের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান বজায় রাখা নির্বাচনের আগে তাঁর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইসরায়েলি বিশ্লেষক আলোন পিঙ্কাসের মতে, নেতানিয়াহুর সিদ্ধান্তকে আসন্ন নির্বাচনের রাজনৈতিক বাস্তবতার বাইরে দেখা কঠিন। তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গাজা যুদ্ধের অবসান এবং একটি সমঝোতায় যাওয়ার চেয়ে নেতানিয়াহুর জন্য সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করার রাজনৈতিক ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম বলে মনে হতে পারে। অন্যদিকে ইসরায়েলি বিশ্লেষক ড্যান পেরি মনে করেন, হামাস নিরস্ত্রীকরণের কোনো বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি হলে সেটিকে ইতিবাচকভাবে দেখা উচিত এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও গাজার মানবিক সংকট—দুই বিষয়কে পরস্পরবিরোধী হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। ফিলিস্তিনি পক্ষ থেকেও পরিকল্পনাটি নিয়ে গভীর সংশয় রয়েছে। গাজায় যুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যে সাধারণ মানুষের প্রধান উদ্বেগ হলো যুদ্ধের স্থায়ী অবসান, নিরাপত্তা, মানবিক সহায়তার অবাধ প্রবেশ এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসন। গাজা থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান নতুন করে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। প্রস্তাবিত কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল গাজায় ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণাধীন ‘ইয়েলো লাইন’ থেকে সেনা প্রত্যাহার, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীর প্রবেশ। এখন ইসরায়েল যদি সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের আগে কোনো প্রত্যাহার না করে, তাহলে পরিকল্পনার ধাপগুলো কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে হামাসও ইঙ্গিত দিয়েছে যে চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ইসরায়েলের নিজস্ব প্রতিশ্রুতি পূরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ উভয় পক্ষের অবস্থানের মধ্যে একটি মৌলিক ‘ক্রম’ বা sequencing-এর সমস্যা তৈরি হয়েছে—হামাস চায় ইসরায়েল তার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করুক, আর ইসরায়েল হামাসের সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণকে প্রত্যাহারের পূর্বশর্ত হিসেবে দেখছে। এই পারস্পরিক অবিশ্বাসই শান্তি উদ্যোগের সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফিলিস্তিনি আলোচক দলের সাবেক উপদেষ্টা জাভিয়ের আবু ঈদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর গাজা পরিকল্পনা এবং পরবর্তী ১৫ দফা নিরস্ত্রীকরণ কাঠামো ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের চেয়ে ইসরায়েলি নিরাপত্তা স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। তাঁর মতে, পরিকল্পনাগুলোতে ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক অধিকার ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। অন্যদিকে ইসরায়েলি সরকারের দৃষ্টিতে হামাসকে অস্ত্রসহ রেখে গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করা ভবিষ্যতে ইসরায়েলি নাগরিক ও সেনাদের জন্য নতুন নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ফলে নেতানিয়াহু সরকার হামাসের সামরিক সক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস বা নিরস্ত্রীকরণকে যুদ্ধ-পরবর্তী ব্যবস্থার মূল শর্ত হিসেবে দেখছে। এদিকে গাজার মানবিক পরিস্থিতিও সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে চলা যুদ্ধে বিপুল সংখ্যক ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, গাজার অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ধ্বংস হয়েছে এবং পানি, স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্য ও বাসস্থানের মতো মৌলিক প্রয়োজনীয়তার সংকট দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। যুদ্ধবিরতির পরও হামলা ও প্রাণহানির অভিযোগ অব্যাহত থাকায় স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে আস্থার ঘাটতি আরও গভীর হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহুর প্রত্যাখ্যান শুধু একটি কূটনৈতিক পরিকল্পনার ওপর আপত্তি নয়; এটি গাজার যুদ্ধ-পরবর্তী ভবিষ্যৎ, হামাসের রাজনৈতিক ও সামরিক অবস্থান, ফিলিস্তিনি প্রশাসনের কাঠামো, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়েও বড় প্রশ্ন তৈরি করছে। ওয়াশিংটন যদি ট্রাম্পের প্রস্তাবকে এগিয়ে নিতে চায়, তাহলে তাকে একদিকে ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং অন্যদিকে ফিলিস্তিনিদের স্থায়ী যুদ্ধবিরতি ও রাজনৈতিক অধিকারের দাবির মধ্যে একটি কার্যকর সমঝোতা তৈরি করতে হবে। কিন্তু নেতানিয়াহু সরকার যদি হামাসের সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণকে ইসরায়েলি প্রত্যাহারের একমাত্র পূর্বশর্ত হিসেবে বজায় রাখে এবং হামাসও ইসরায়েলি প্রত্যাহার ও যুদ্ধের স্থায়ী সমাপ্তি ছাড়া অস্ত্র সমর্পণে অস্বীকৃতি জানায়, তাহলে ট্রাম্পের ১৫ দফা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথ আরও কঠিন হয়ে পড়বে। ফলে গাজায় যুদ্ধের অবসান নিয়ে নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতা, ইসরায়েলের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং হামাসের অবস্থান—এই তিনটি উপাদানের ওপরই নির্ভর করছে পরবর্তী পরিস্থিতি। নেতানিয়াহুর প্রত্যাখ্যানের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন একটাই—ট্রাম্প প্রশাসন কি ইসরায়েলকে পরিকল্পনাটি মেনে নিতে চাপ দেবে, নাকি ওয়াশিংটন নতুন কোনো সমঝোতার পথ খুঁজবে? এর উত্তরই নির্ধারণ করতে পারে গাজায় দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধবিরতি ও রাজনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা, অথবা সংঘাতের আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার ঝুঁকি।
