উত্তর কোরিয়ার দ্রুত পরিবর্তনশীল সামরিক সক্ষমতা এবং নতুন ধরনের যুদ্ধকৌশলের সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় আগামী ১৭ থেকে ২৭ আগস্ট পর্যন্ত বড় ধরনের যৌথ সামরিক মহড়া পরিচালনা করতে যাচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র। বার্ষিক ‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’ বা ইউএফএস মহড়ায় ড্রোন হামলা, জিপিএস ব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, সাইবার হামলা এবং অন্যান্য আধুনিক যুদ্ধ পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা যাচাই করা হবে বলে সোমবার দুই দেশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। মিত্র দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এবারের মহড়ার মাধ্যমে সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি দক্ষিণ কোরীয় সরকারের জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতিও পরীক্ষা করা হবে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন কম্বাইন্ড ফোর্সেস কমান্ড, জাতিসংঘ কমান্ড ও ইউএস ফোর্সেস কোরিয়ার জনসংযোগ বিভাগের পরিচালক রায়ান ডোনাল্ড বলেন, আধুনিক যুদ্ধে মনুষ্যবিহীন ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং সাইবার অভিযান ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে এবং এই পরিবর্তিত বাস্তবতাকে মাথায় রেখেই এবারের প্রশিক্ষণ ও মহড়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। তিনি বলেন, উত্তর কোরিয়ার সেনারা ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নিয়ে সেখানকার যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে এবং সেই অভিজ্ঞতা তারা উত্তর কোরিয়ায় ফিরিয়ে নিয়ে গেছে, যা দেশটির সামরিক সক্ষমতার চরিত্রে পরিবর্তন আনতে পারে। ডোনাল্ডের ভাষ্য অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়ার নতুন সক্ষমতাকে বিবেচনায় নিয়েই মিত্র বাহিনীর প্রশিক্ষণ পরিচালিত হবে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, মহড়াটি কোরীয় উপদ্বীপের সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলা এবং দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষার ওপরই কেন্দ্রীভূত থাকবে। দক্ষিণ কোরিয়ার জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের ক্যাপ্টেন জাং দো-ইয়ং জানান, এবারের মহড়ায় প্রায় ১৮ হাজার দক্ষিণ কোরীয় সেনা অংশ নেবেন, যা আগের বছরগুলোর তুলনায় প্রায় একই মাত্রার। ওয়াশিংটন ও সিউল নিয়মিতভাবেই এই সামরিক মহড়াকে প্রতিরক্ষামূলক এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও যৌথ সামরিক প্রস্তুতি জোরদারের অংশ হিসেবে বর্ণনা করে থাকে। তবে উত্তর কোরিয়া দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ সামরিক মহড়াকে উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড হিসেবে অভিহিত করে আসছে এবং এসব মহড়া কোরীয় উপদ্বীপে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দেয় বলে অভিযোগ করে থাকে। এর মধ্যেই গত সপ্তাহে উত্তর কোরিয়া সমুদ্রের দিকে একটি স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে, যা দেশটির অব্যাহত ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং সামরিক তৎপরতার সর্বশেষ উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও পিয়ংইয়ং পারমাণবিক অস্ত্র, ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, দূরপাল্লার কামানসহ বিভিন্ন প্রচলিত ও কৌশলগত সামরিক সক্ষমতা উন্নয়ন অব্যাহত রেখেছে। একই সময়ে দক্ষিণ ও উত্তর কোরিয়ার সম্পর্কও আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। উত্তর কোরিয়া সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে পুনরেকত্রীকরণের ধারণা থেকে আরও দূরে সরে গিয়ে তার সংবিধান সংশোধন করেছে এবং দক্ষিণ কোরিয়াকে পৃথক ও বৈরী রাষ্ট্র হিসেবে দেখানোর অবস্থান আরও স্পষ্ট করেছে। পিয়ংইয়ং নিজেকে একটি ‘দায়িত্বশীল পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র’ হিসেবে বর্ণনা করার পাশাপাশি পারমাণবিক অস্ত্রের উন্নয়ন অব্যাহত রাখার অঙ্গীকারও করেছে। ফলে কোরীয় উপদ্বীপে সামরিক ভারসাম্য, পারমাণবিক প্রতিরোধ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও গভীর হয়েছে। এবারের উলচি ফ্রিডম শিল্ড মহড়ায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে ড্রোন ও অন্যান্য মনুষ্যবিহীন সামরিক ব্যবস্থার ব্যবহার, জিপিএস সংকেত বিঘ্নিত করার মতো ইলেকট্রনিক যুদ্ধকৌশল এবং সাইবার হামলার মোকাবিলা। ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ও সাইবার সক্ষমতার গুরুত্বকে নতুন করে সামনে এনেছে এবং সেই পরিবর্তিত বাস্তবতা পূর্ব এশিয়ার সামরিক পরিকল্পনাতেও প্রভাব ফেলছে। যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়া বলছে, তাদের যৌথ মহড়ার মূল লক্ষ্য হলো যেকোনো সম্ভাব্য সংকটের ক্ষেত্রে দ্রুত ও সমন্বিতভাবে প্রতিক্রিয়া জানানোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করা। তবে উত্তর কোরিয়া এই মহড়াকে কীভাবে দেখবে এবং এর জবাবে নতুন কোনো ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা বা সামরিক পদক্ষেপ নেবে কি না, তা নিয়ে আঞ্চলিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। ফলে আগামী ১৭ থেকে ২৭ আগস্টের এই মহড়া কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক প্রস্তুতির পরীক্ষা নয়, বরং উত্তর কোরিয়ার ক্রমবর্ধমান পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা, ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে পাওয়া নতুন সামরিক অভিজ্ঞতা এবং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যেও কোরীয় উপদ্বীপে প্রতিরোধ ও সামরিক ভারসাম্য বজায় রাখার বড় পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
