চীনের বিপুল বাণিজ্য উদ্বৃত্ত এবং দেশটির রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিকে ঘিরে বৈশ্বিক ভারসাম্যহীনতা নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক চাপ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছেন, বিশ্বের বৃহৎ অর্থনীতিগুলোর জোট জি-২০ভুক্ত দেশগুলোর উচিত চীনের সঙ্গে নিজেদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও শুল্কব্যবস্থা নতুন করে পর্যালোচনা করা এবং প্রয়োজন হলে চীনা পণ্যের ওপর আরও বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করা। জি-২০ অর্থমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরদের বৈঠকের আগে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বেসেন্ট বলেন, চীনের বর্তমান রপ্তানি প্রবাহ দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য টেকসই নয় এবং বেইজিংকে অর্থনীতির ভারসাম্য রপ্তানি থেকে অভ্যন্তরীণ ভোগ ও চাহিদার দিকে সরিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। তাঁর ভাষায়, বিশ্বের অর্থনীতি এমন একটি পরিস্থিতি বহন করতে পারে না যেখানে চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত প্রায় ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছে যায়। বেসেন্টের মন্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে যখন যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর শুল্কনীতি চীন থেকে সরাসরি আমদানি কমাতে ভূমিকা রাখলেও একই সঙ্গে চীনা পণ্যের প্রবাহ বিশ্বের অন্যান্য বাজারে—বিশেষ করে ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকায়—বাড়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, চীনের অতিরিক্ত শিল্প সক্ষমতা, রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি এবং দুর্বল অভ্যন্তরীণ চাহিদা দেশটির উৎপাদন খাতকে ক্রমাগত রপ্তানিনির্ভর করে তুলছে, যার ফলে অন্যান্য দেশ তাদের নিজস্ব শিল্প ও কর্মসংস্থান রক্ষায় ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে পড়ছে। বেসেন্টের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে চীনা পণ্যের বিরুদ্ধে উচ্চ শুল্ক ও বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে নিজস্ব বাজারকে অনেকাংশে সুরক্ষিত করেছে, কিন্তু এককভাবে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ বৈশ্বিক বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা সমাধান করতে পারবে না; বরং চীনা আমদানির চাপ মোকাবিলায় অন্যান্য শিল্পোন্নত অর্থনীতিকেও নিজেদের বাণিজ্যিক নীতি পুনর্বিবেচনা করতে হবে। তিনি বলেন, গত বছরই তিনি অন্যান্য শিল্পোন্নত দেশকে সতর্ক করেছিলেন যে চীনের রপ্তানি বৃদ্ধির প্রভাব তাদের বাজারেও পড়বে, আর এখন তারা সেই বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র জি-২০ বৈঠকে বাণিজ্য ও চলতি হিসাবের ভারসাম্যহীনতা কমাতে একটি যৌথ অবস্থান বা বিবৃতি তৈরির চেষ্টা করছে। এর মাধ্যমে ওয়াশিংটন শুধু চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ঘাটতি নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চীনের দীর্ঘস্থায়ী বাণিজ্য উদ্বৃত্তের প্রভাবকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে চাইছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য ঘাটতি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমে ৭৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে বলে মার্কিন সেন্সাস ব্যুরোর তথ্য উদ্ধৃত করে জানানো হয়েছে। তবে ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে এই উন্নতি বৃহত্তর বৈশ্বিক ভারসাম্যহীনতার সমস্যাকে সমাধান করছে না। এদিকে কিছু অর্থনীতিবিদ ও ইউরোপীয় নেতারা চীনের মুদ্রা ইউয়ানের মূল্য বাড়ানোর মাধ্যমে বাণিজ্য ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার পক্ষে মত দিলেও বেসেন্ট এই ধারণার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মূল্যায়নে ইউয়ানকে উল্লেখযোগ্যভাবে অবমূল্যায়িত বলে বিবেচনা করা হলেও বেসেন্টের মতে, শুধু মুদ্রার বিনিময় হার পরিবর্তন করলে সমস্যার মূল কারণ দূর হবে না। ১৯৮৫ সালের প্লাজা অ্যাকর্ডের মতো কোনো নতুন মুদ্রা সমঝোতার মাধ্যমে বৈশ্বিক বাণিজ্য ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার প্রস্তাবও তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর মতে, মূল সমস্যা হচ্ছে চীনের শিল্পখাতে ব্যাপক সরকারি ভর্তুকি এবং দেশটির দুর্বল অভ্যন্তরীণ ভোক্তা চাহিদা। একই সময়ে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে সীমিত পরিসরে বাণিজ্য উত্তেজনা কমানোর আলোচনাও অব্যাহত রাখার প্রস্তুতি চলছে। বেসেন্ট জানিয়েছেন, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ নয় এমন পণ্যের ওপর আরোপিত কিছু শুল্ক কমানোর সম্ভাবনা নিয়ে দুই দেশ আলোচনা চালিয়ে যাবে। তাঁর ধারণা, উভয় পক্ষই প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারের অ-কৌশলগত ও অতি গুরুত্বপূর্ণ নয় এমন পণ্যের ওপর থেকে শুল্ক প্রত্যাহারের সুযোগ খুঁজে পেতে পারে। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির নিরাপত্তা নিয়েও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হবে, বিশেষ করে শক্তিশালী এআই মডেল যাতে অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র বা অন্যান্য অননুমোদিত গোষ্ঠীর হাতে না পৌঁছায় সে বিষয়ে সম্ভাব্য নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা চালানোর কথা জানিয়েছেন বেসেন্ট। তবে ওয়াশিংটন-বেইজিং সম্পর্কের এই সীমিত সংলাপের মধ্যেও বৃহত্তর বাণিজ্য বিরোধ অব্যাহত রয়েছে। মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট জরুরি আইনের আওতায় আরোপিত ট্রাম্প প্রশাসনের বিস্তৃত শুল্কের একটি বড় অংশ বাতিল করার পর যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন আইনি কাঠামোর মাধ্যমে শুল্কনীতি পুনর্গঠন করতে হচ্ছে। এরই মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসন চীনা পণ্যের ওপর পৃথক তদন্তের ভিত্তিতে নতুন শুল্ক আরোপ করেছে এবং অতিরিক্ত শিল্প উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে আরেকটি তদন্তের মাধ্যমে ভবিষ্যতে আরও শুল্ক আরোপের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আগামী সেপ্টেম্বরের শেষদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য বৈঠককে সামনে রেখে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক নতুন এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে প্রবেশ করছে। এই বৈঠকের আগে বাণিজ্য, শুল্ক, শিল্প ভর্তুকি, বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনার পরিধি বাড়তে পারে। একই সময়ে অ্যাশভিলে অনুষ্ঠিত জি-২০ বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র যদি অন্যান্য প্রধান অর্থনীতিকে চীনের বিরুদ্ধে সমন্বিত বাণিজ্যিক অবস্থান গ্রহণে রাজি করাতে পারে, তবে তা বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থায় নতুন চাপ ও অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। তবে এমন পদক্ষেপের বিপরীতে চীন কী ধরনের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া জানাবে, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক বাজারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ফলে বেসেন্টের আহ্বান শুধু যুক্তরাষ্ট্র-চীন দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বিরোধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং এটি বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থার কাঠামো, চীনের অর্থনৈতিক মডেল এবং বিশ্বের প্রধান অর্থনীতিগুলোর পারস্পরিক নির্ভরতার ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি বৃহত্তর বিতর্কের সূচনা করছে।
