তেল আবিবসহ প্রতিপক্ষ দেশগুলোর বিরুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাব্য পরিকল্পনা করছে ইরান, এমন গুরুতর অভিযোগ তুলেছে ইসরায়েল। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও কয়েকটি উপসাগরীয় দেশের কর্মকর্তাদের কাছে গোয়েন্দা তথ্য উপস্থাপন করেছে দেশটি। তবে ইসরায়েলের এই মূল্যায়নকে ঘিরে ওয়াশিংটনের মধ্যেই মতভেদ তৈরি হয়েছে। কোনো কোনো মার্কিন কর্মকর্তা সম্ভাব্য হুমকিটিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখলেও অন্যরা গোয়েন্দা তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন। উপসাগরীয় কয়েকটি দেশও ইসরায়েলের উপস্থাপিত তথ্যকে যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য মনে করেনি বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ইসরায়েলের গোয়েন্দা সতর্কবার্তা
৩ নভেম্বর প্রকাশিত দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনের বরাতে জানা গেছে, ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোকে জানিয়েছে, ইরান তাদের বিরুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করছে। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা মার্কিন কর্মকর্তাদের কাছে দাবি করেছেন, তেহরান ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে রাসায়নিক পদার্থ বহনের প্রযুক্তি উন্নয়নের চেষ্টা করছে। পাশাপাশি প্রতিপক্ষ দেশগুলোর ভেতরে গোপনে রাসায়নিক অস্ত্র প্রবেশ করানোর সম্ভাব্য সক্ষমতা নিয়েও সতর্ক করা হয়েছে।
ইসরায়েলের মূল্যায়ন অনুযায়ী, রাসায়নিক অস্ত্রের সম্ভাব্য হুমকি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির চেয়েও তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। গত কয়েক সপ্তাহে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনায় ইসরায়েলি কর্মকর্তারা এই আশঙ্কাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ইসরায়েলের এসব বক্তব্যের পক্ষে কী ধরনের নির্দিষ্ট প্রমাণ রয়েছে, তা প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে অভিযোগের সত্যতা এবং ইরানের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের মধ্যে মতভেদ
ইসরায়েলের গোয়েন্দা তথ্য ওয়াশিংটনে এক ধরনের বিতর্ক তৈরি করেছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের একটি অংশ ইরানের সম্ভাব্য রাসায়নিক অস্ত্রের সক্ষমতা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার ঝুঁকি নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এবং মধ্যপ্রাচ্যে দেশটির সামরিক ও কৌশলগত স্বার্থের বিরুদ্ধে ইরানের সম্ভাব্য পদক্ষেপের বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা ইসরায়েলের দেওয়া তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের আশঙ্কা, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে আবারও বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করতে রাজি করানোর জন্য এই গোয়েন্দা মূল্যায়নকে ব্যবহার করতে পারে।
এই মতভেদ যুক্তরাষ্ট্রের সামনে একটি জটিল পরিস্থিতি তৈরি করেছে। একদিকে সম্ভাব্য রাসায়নিক অস্ত্রের হুমকিকে উপেক্ষা করার ঝুঁকি রয়েছে, অন্যদিকে যথেষ্ট প্রমাণ ছাড়া গোয়েন্দা মূল্যায়নের ভিত্তিতে সামরিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিপদও রয়েছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর সংশয়
ইসরায়েল শুধু যুক্তরাষ্ট্রকেই নয়, উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশের কর্মকর্তাদের কাছেও তাদের গোয়েন্দা মূল্যায়ন তুলে ধরেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
তবে এসব দেশের কয়েকজন কর্মকর্তা ইসরায়েলের উপস্থাপিত তথ্য নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, ইসরায়েলের দেওয়া ব্রিফিংয়ে নির্দিষ্ট প্রমাণের পরিবর্তে মূলত গোয়েন্দা মূল্যায়ন ও সম্ভাব্য পরিস্থিতির ব্যাখ্যা তুলে ধরা হয়েছে।
কিছু উপসাগরীয় কর্মকর্তা মনে করছেন, ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক অংশীদারদের ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর সামরিক অবস্থান নিতে উৎসাহিত করার চেষ্টা করছে। ফলে এই অভিযোগকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে নিরাপত্তা মূল্যায়নের পার্থক্যও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
রাসায়নিক অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির উদ্বেগ
ইসরায়েলের অভিযোগের সবচেয়ে উদ্বেগজনক অংশ হলো ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে রাসায়নিক পদার্থ বহনের সম্ভাব্য প্রযুক্তি উন্নয়নের বিষয়টি। কোনো দেশ যদি রাসায়নিক অস্ত্রকে ক্ষেপণাস্ত্র বা অন্য কোনো বাহকের সঙ্গে যুক্ত করার সক্ষমতা অর্জন করে, তাহলে সম্ভাব্য হামলার ঝুঁকি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
তবে রাসায়নিক পদার্থ বহনের প্রযুক্তি থাকা এবং কার্যকরভাবে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করতে সক্ষম হওয়া এক বিষয় নয়। এ ধরনের অস্ত্রের কার্যকারিতা, বিস্তার, নিয়ন্ত্রণ এবং লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানোর সক্ষমতা নির্ভর করে একাধিক প্রযুক্তিগত ও সামরিক বিষয়ের ওপর।
বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্রে রাসায়নিক অস্ত্র স্থাপন করার প্রযুক্তিগত দিকের পাশাপাশি রাসায়নিক পদার্থের কার্যকর বিস্তার নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ। ফলে শুধু প্রযুক্তি উন্নয়নের অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো দেশের আসন্ন রাসায়নিক হামলার সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
ইসরায়েলের নিজস্ব প্রস্তুতি নিয়েও প্রশ্ন
ইসরায়েলের অভিযোগের পাশাপাশি দেশটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা প্রস্তুতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনের বরাতে জানা গেছে, ওই সপ্তাহে ইসরায়েলের হোম ফ্রন্ট কমান্ডের পরিচালিত জরুরি প্রস্তুতি মহড়ায় রাসায়নিক অস্ত্রের হুমকি বিশেষ গুরুত্ব পায়নি।
এ ছাড়া দেশটির সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে ব্যাপকভাবে গ্যাসমাস্ক বিতরণ পুনরায় শুরু করার কোনো তথ্যও প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়টি ইসরায়েলের গোয়েন্দা সতর্কবার্তার সঙ্গে বাস্তব প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য তুলে ধরেছে। যদিও কোনো দেশের নিরাপত্তা প্রস্তুতির সব তথ্য প্রকাশ্যে থাকে না, তবু সম্ভাব্য হুমকির মাত্রা নির্ধারণে সরকারি প্রস্তুতি ও জরুরি ব্যবস্থার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ।
ইরানের অবস্থান ও অতীতের রাসায়নিক অস্ত্র বিতর্ক
ইরানের বিরুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে অভিযোগ নতুন নয়। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় ১৯৮০-এর দশকে রাসায়নিক অস্ত্রের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল ইরানকে। সেই যুদ্ধের সময় ইরানি সেনা ও বেসামরিক মানুষ রাসায়নিক হামলার শিকার হয়েছিলেন।
ইরান অতীতে রাসায়নিক অস্ত্রের সক্ষমতা নিয়ে গবেষণা ও উন্নয়নের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। দেশটির বক্তব্য, রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক নীতির পরিপন্থী।
বর্তমান অভিযোগের ক্ষেত্রেও ইরানের প্রকৃত অবস্থান, সম্ভাব্য সক্ষমতা এবং কোনো আক্রমণাত্মক পরিকল্পনা রয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। অতীতের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা কিংবা কোনো দেশের সামরিক সক্ষমতা একাই বর্তমান সময়ে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের পরিকল্পনার প্রমাণ হতে পারে না।
আন্তর্জাতিক আইনে রাসায়নিক অস্ত্রের নিষেধাজ্ঞা
রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার আন্তর্জাতিক আইনে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। ১৯৯৩ সালে গৃহীত এবং ১৯৯৭ সালে কার্যকর হওয়া রাসায়নিক অস্ত্র কনভেনশন অনুযায়ী রাসায়নিক অস্ত্রের উন্নয়ন, উৎপাদন, মজুত ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এই চুক্তির বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ করে রাসায়নিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ সংস্থা বা OPCW। কোনো দেশের বিরুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ উঠলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তদন্ত, প্রমাণ সংগ্রহ এবং দায় নির্ধারণের বিষয়টি সামনে আসতে পারে।
এ ধরনের অস্ত্রের ব্যবহার শুধু সামরিক স্থাপনা বা প্রতিপক্ষ বাহিনীর জন্য হুমকি নয়। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় রাসায়নিক হামলা হলে শিশু, নারী, বৃদ্ধসহ বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষ প্রাণঘাতী ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা, পরিবেশ এবং দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ সংঘাতে কী প্রভাব পড়তে পারে
ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান সামরিক ও রাজনৈতিক বিরোধের প্রেক্ষাপটে রাসায়নিক অস্ত্রের অভিযোগ নতুন করে উত্তেজনা বাড়াতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র যদি ইসরায়েলের গোয়েন্দা মূল্যায়নকে গুরুত্ব দিয়ে নতুন নিরাপত্তা পদক্ষেপ নেয়, তাহলে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার সম্পর্ক আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে, উপসাগরীয় দেশগুলোর সংশয় এবং মার্কিন কর্মকর্তাদের মতভেদ দেখাচ্ছে যে ইসরায়েলের অভিযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এখনো একক অবস্থান তৈরি হয়নি। এই পরিস্থিতিতে গোয়েন্দা তথ্যের নিরপেক্ষ যাচাই এবং কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর জন্য নতুন কোনো সামরিক সংঘাত এড়িয়ে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। কারণ ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে তার প্রভাব জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা এবং বিশ্ব অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।
সামনে কী অপেক্ষা করছে
ইসরায়েলের উত্থাপিত অভিযোগের পর এখন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নজর যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী অবস্থান এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রতিক্রিয়ার দিকে। বিশেষ করে গোয়েন্দা তথ্যের পক্ষে কোনো যাচাইযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ করা হয় কি না, ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে কী প্রতিক্রিয়া জানায় এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বিষয়টি নিয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয় কি না, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, ইরান সত্যিই রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে, নাকি ইসরায়েলের গোয়েন্দা মূল্যায়নে সম্ভাব্য ঝুঁকিকে বাস্তব পরিকল্পনা হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। এ প্রশ্নের উত্তর এখনো নিশ্চিত নয়।
