সামরিক ও কৌশলগত প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে ইসরায়েল ও তুরস্কের মধ্যকার উত্তেজনা দ্রুত নতুন মাত্রা পেয়েছে। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানকে সতর্ক করে বলেছেন, আঙ্কারা সিরিয়ায় এমন কোনো পদক্ষেপ নিলে তা ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে এবং ইসরায়েল তার নিরাপত্তা রক্ষায় কোনো শক্তিকে ছাড় দেবে না। কাটজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় অভিযোগ করেন, এরদোয়ান তুরস্ককে সিরিয়ায় “বিপজ্জনক অভিযানের” দিকে নিয়ে যাচ্ছেন এবং ইসরায়েলের প্রতিরক্ষার সক্ষমতা পরীক্ষা না করার জন্য তুর্কি প্রেসিডেন্টকে সতর্ক করেন।
এই সতর্কবার্তার পেছনে রয়েছে সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিতে ইসরায়েলি বিমান হামলা। ১৮ আগস্ট ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান সিরিয়ার ইদলিব অঞ্চলের ওই বিমানঘাঁটিতে একাধিক হামলা চালায়। সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের উদ্ধৃতি দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, হামলায় রানওয়ে ও সংরক্ষণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। ইসরায়েল সরাসরি হামলার দায় স্বীকার না করলেও পরবর্তী বক্তব্যে স্পষ্ট হয় যে, সিরিয়ায় তুরস্কের সম্ভাব্য সামরিক উপস্থিতি নিয়ে ইসরায়েলের উদ্বেগই এই পদক্ষেপের অন্যতম কারণ ছিল।
ইসরায়েলের দাবি ছিল, দামেস্ক ওই ঘাঁটিতে তুর্কি সামরিক উপস্থিতির সুযোগ তৈরি করে একটি বিদ্যমান নিরাপত্তাব্যবস্থাকে পরিবর্তনের পথে এগোচ্ছিল। কিন্তু তুরস্ক এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। আঙ্কারা জানিয়েছে, হামলার সময় ওই ঘাঁটিতে কোনো তুর্কি সেনা মোতায়েন ছিল না এবং সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক সহযোগিতা মূলত প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ। সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানি আরও বলেছেন, আবু আল-দুহুরে তুরস্কের কোনো স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি বা স্থায়ী সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনা ছিল না এবং এ বিষয়ে ইসরায়েলকেও অবহিত করা হয়েছিল।
অন্যদিকে, তুরস্ক ইসরায়েলি হামলাকে কঠোরভাবে নিন্দা করে বলেছে, সিরিয়ার অবকাঠামো ও সামরিক সক্ষমতার ওপর ধারাবাহিক হামলা দেশটির ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। আঙ্কারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
সিরিয়ায় প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পতনের পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ২০২৪ সালের শেষ দিকে আসাদ সরকারের পতনের পর নতুন নেতৃত্বের অধীনে সিরিয়া পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় তুরস্ক সামরিক প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা সহযোগিতা ও পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেওয়ার চেষ্টা করছে। একই সময়ে ইসরায়েল সিরিয়ার নতুন সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দেশটির ভেতরে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির প্রভাব বিস্তারকে সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে দেখছে। ফলে দামেস্ককে কেন্দ্র করে আঙ্কারা ও জেরুজালেমের কৌশলগত স্বার্থ ক্রমেই মুখোমুখি অবস্থানে যাচ্ছে।
পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করে যুক্তরাষ্ট্রও দুই দেশের উত্তেজনা কমাতে সক্রিয় হয়েছে। সিরিয়া বিষয়ক মার্কিন বিশেষ দূত টম ব্যারাক ইসরায়েলি হামলাকে “অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা” হিসেবে অভিহিত করে ইসরায়েল, তুরস্ক ও সিরিয়ার মধ্যে একটি কার্যকর যোগাযোগ ও সংঘাত-নিরসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। ওয়াশিংটনের আশঙ্কা, সিরিয়ায় ভুল বোঝাবুঝি বা সামরিক হিসাবের ভুল থেকে ইসরায়েল ও তুরস্কের মতো দুটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক শক্তির মধ্যে সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিকে ঘিরে সাম্প্রতিক সংঘাত কেবল একটি সামরিক স্থাপনায় হামলার ঘটনা নয়; বরং এটি আসাদ-পরবর্তী সিরিয়ার ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কাঠামো, আঞ্চলিক প্রভাব এবং সামরিক ভারসাম্য নিয়ে বৃহত্তর প্রতিযোগিতার বহিঃপ্রকাশ। তুরস্ক সিরিয়ার নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে দেশটির নিরাপত্তা কাঠামো পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখতে চাইছে, আর ইসরায়েল সিরিয়ার ভূখণ্ডে এমন কোনো সামরিক পরিবর্তন মেনে নিতে চাইছে না যা তার সীমান্ত ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
ফলে এরদোয়ানকে কাটজের সরাসরি সতর্কবার্তা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও সামরিক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদিও ইসরায়েল ও তুরস্ক—উভয় পক্ষই সরাসরি যুদ্ধের পথে যাওয়ার কথা বলছে না, সিরিয়ায় তাদের স্বার্থের সংঘাত যত গভীর হচ্ছে, ততই একটি ভুল পদক্ষেপ বা ভুল সামরিক হিসাব বৃহত্তর আঞ্চলিক সংকট তৈরি করতে পারে। ওয়াশিংটনের মধ্যস্থতায় সংঘাত-নিরসন ব্যবস্থা তৈরির উদ্যোগ তাই এখন শুধু কূটনৈতিক প্রয়োজন নয়, বরং ইসরায়েল, তুরস্ক ও সিরিয়ার মধ্যে সম্ভাব্য সামরিক সংঘর্ষ ঠেকানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠেছে।
