জাতিসংঘের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ বকেয়া অর্থ পরিশোধের উদ্যোগ হিসেবে ট্রাম্প প্রশাসন ৭২৫ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার পরিকল্পনা করছে, যা আন্তর্জাতিক সংস্থাটির দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকট মোকাবিলায় সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে বলে মনে করছেন জাতিসংঘের অর্থনীতি ও উন্নয়নবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা, তবে ওয়াশিংটনের প্রস্তাবিত অর্থ জাতিসংঘের দাবি করা মোট বকেয়ার তুলনায় এক-পঞ্চমাংশেরও কম হওয়ায় এর মাধ্যমে সংস্থাটির আর্থিক সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। কংগ্রেসে পাঠানো মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ৪ আগস্টের একটি নোটিশে জাতিসংঘের নিয়মিত বাজেটের জন্য এই অর্থ বরাদ্দের কথা জানানো হয়েছে, যা এর আগে প্রকাশ্যে আসেনি; বিষয়টি এমন এক সময়ে সামনে এলো যখন আগামী মাসে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে এবং একই সময়ে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সংস্থাটির আর্থিক পরিস্থিতিকে গুরুতর সংকট হিসেবে তুলে ধরেছেন। জাতিসংঘের হিসাবে, চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সংস্থাটির পাওনা ছিল ৪ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি, যার মধ্যে প্রায় ২ দশমিক ০৪ বিলিয়ন ডলার নিয়মিত বাজেটের এবং প্রায় ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার বর্তমান ও অতীতের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের অর্থ; আরও প্রায় ৪৪ মিলিয়ন ডলার পাওনা রয়েছে জাতিসংঘের ট্রাইব্যুনালগুলোর জন্য। এর বিপরীতে প্রস্তাবিত ৭২৫ মিলিয়ন ডলার জাতিসংঘের দাবিকৃত মোট বকেয়ার ২০ শতাংশেরও কম। তবে ওয়াশিংটন জাতিসংঘের বকেয়ার হিসাবের সঙ্গে একমত নয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইতোমধ্যে তারা কিছু অর্থ পরিশোধ করেছে। মার্কিন প্রশাসন জানিয়েছে, প্রস্তাবিত অর্থ ছাড় জাতিসংঘের সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখার ওপর নির্ভর করবে। ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরে জাতিসংঘের ব্যয় কাঠামো, কার্যকারিতা এবং বিভিন্ন সংস্থার ভূমিকার সমালোচনা করে আসছে এবং ইতোমধ্যে জাতিসংঘের একাধিক সংস্থায় স্বেচ্ছা অর্থায়ন কমিয়েছে; একই সঙ্গে প্রশাসন বলছে, গত ছয় মাসে জাতিসংঘের কাঠামোতে এমন কিছু সংস্কার হয়েছে, যার মাধ্যমে প্রায় এক বিলিয়ন ডলারের ব্যয় কমানো সম্ভব হয়েছে। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক সংকটের মাত্রা বোঝা যায় সংস্থাটির নিজস্ব হিসাবেও; চলতি বছরের বাজেট ঘাটতি সামাল দিতে জাতিসংঘ ২০২৬ সালের বাজেট ৯ দশমিক ২ শতাংশ কমিয়েছে এবং জেনেভা ও নিউইয়র্কের মতো ব্যয়বহুল শহর থেকে দুই হাজারের বেশি চাকরি তুলনামূলক কম ব্যয়ের কেন্দ্রগুলোতে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিব গুতেরেস এর আগে সতর্ক করে বলেছিলেন, সদস্যরাষ্ট্রগুলোর বকেয়া পরিশোধে ব্যর্থতার কারণে সংস্থাটি গুরুতর আর্থিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে পারে। জাতিসংঘের সাবেক কর্মকর্তা ইউজিন চেনের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ৭২৫ মিলিয়ন ডলারের অর্থপ্রদান জাতিসংঘের কর্মীদের বেতনসহ জরুরি ব্যয় মেটাতে কিছুটা সময় কিনে দিতে পারে, তবে এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়; তার ভাষায়, এই অর্থ সংস্থাটিকে কিছুটা সময়ের জন্য সচল রাখবে। জাতিসংঘের অর্থায়ন বিশেষজ্ঞ রনি পাটজও মনে করেন, বড় অঙ্কের অর্থ এখন পাওয়া গেলে সংস্থাটি বছরের শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের তাৎক্ষণিক ব্যয় সংকট এড়াতে পারবে, কিন্তু অর্থ না এলে বছরের শেষ দুই থেকে তিন মাসে কর্মীদের বেতন দেওয়া এবং সংস্থার স্বাভাবিক কার্যক্রম চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। পরিস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জাতিসংঘ সনদের ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদ, যার আওতায় কোনো সদস্যরাষ্ট্রের বকেয়া যদি দুই বছরের বার্ষিক চাঁদার সমপরিমাণ ছাড়িয়ে যায়, তাহলে সাধারণ পরিষদে তার ভোটাধিকার হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়, যদিও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ছাড়ের সুযোগ রয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পিত অর্থপ্রদান শুধু জাতিসংঘের আর্থিক ব্যবস্থাপনার জন্য নয়, ওয়াশিংটনের ভবিষ্যৎ ভোটাধিকার নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থদাতা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের নিয়মিত বাজেট ও শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এলেও ট্রাম্প প্রশাসন বাধ্যতামূলক অর্থপ্রদান নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থায় স্বেচ্ছা তহবিলও ব্যাপকভাবে কমিয়েছে। একই সময়ে ওয়াশিংটন জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের বেশ কয়েকটি সংস্থা থেকে সরে যাওয়ার পদক্ষেপ নিয়েছে এবং জাতিসংঘে চীনের প্রভাব নিয়ন্ত্রণসহ আরও ব্যয়সংকোচন ও প্রশাসনিক সংস্কারের দাবি তুলেছে। জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে ১৮ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ১২৯টি দেশ তাদের চলতি বছরের অর্থপ্রদান পুরোপুরি সম্পন্ন করলেও দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থদাতা চীনও তখন পর্যন্ত পূর্ণ অর্থপ্রদানকারী দেশের তালিকায় ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত ৭২৫ মিলিয়ন ডলার তাই একদিকে জাতিসংঘের জন্য তাৎক্ষণিক আর্থিক চাপ কিছুটা কমানোর সম্ভাবনা তৈরি করেছে, অন্যদিকে এই অর্থপ্রদানের সঙ্গে যুক্ত সংস্কার-শর্ত ও ওয়াশিংটনের কঠোর অবস্থান জাতিসংঘের ভবিষ্যৎ অর্থায়ন কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক কোন দিকে যাবে, সেই প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে। জাতিসংঘ যখন ‘ইউএন৮০’ নামে সংস্কার ও ব্যয়সংকোচনের একটি বড় কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের এই আংশিক অর্থপ্রদানের সিদ্ধান্তকে অনেকেই সংস্থাটিকে পুরোপুরি ছেড়ে না গিয়ে আরও কঠোর সংস্কারের দিকে ঠেলে দেওয়ার একটি কৌশল হিসেবে দেখছেন; ফলে আগামী মাসে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ট্রাম্পের বক্তব্যের আগে ৭২৫ মিলিয়ন ডলারের এই ঘোষণা ওয়াশিংটন ও জাতিসংঘের মধ্যকার আর্থিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক মনোযোগ তৈরি করেছে।
