মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ কয়েক মাসের সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি এবং কূটনৈতিক আলোচনা শুরু হলেও হরমুজ প্রণালীর ভবিষ্যৎ প্রশাসন ও সম্ভাব্য ট্রানজিট ফি নিয়ে নতুন বিরোধ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এই বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, যিনি স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন যে হরমুজ একটি আন্তর্জাতিক জলপথ এবং কোনো দেশ সেখানে চলাচলকারী জাহাজের ওপর একতরফাভাবে টোল বা ট্রানজিট ফি আরোপ করার অধিকার রাখে না।
সংযুক্ত আরব আমিরাত সফরের সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে রুবিও বলেন, “হরমুজ প্রণালী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জলপথ। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী কোনো রাষ্ট্র সেখানে যাতায়াতের জন্য বাধ্যতামূলক টোল আরোপ করতে পারে না।” তাঁর এই বক্তব্য মূলত ইরানের সাম্প্রতিক পরিকল্পনার প্রতিক্রিয়া, যেখানে তেহরান যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতে প্রণালী ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন ধরনের সার্ভিস চার্জ বা ফি চালুর সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সুইজারল্যান্ডে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের আওতায় ৬০ দিনের জন্য সম্ভাব্য ফি স্থগিত রাখা হলেও ইরানের শীর্ষ আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ ইতোমধ্যে জানিয়ে দিয়েছেন যে যুদ্ধ-পূর্ব বাস্তবতায় আর ফেরা হবে না। তাঁর মতে, হরমুজ প্রণালীতে ইরানের নতুন নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা হবে, যা দেশটির কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
বিশ্বের মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে অতিক্রম করে। ফলে এই জলপথে যেকোনো ধরনের অস্থিরতা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। যুদ্ধ চলাকালে ইরান কার্যত প্রণালী বন্ধ করে দিলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং শত শত জাহাজ আটকা পড়ে। বর্তমানে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা ও ওমানের সহায়তায় হাজার হাজার নাবিককে উদ্ধার এবং নিরাপদ নৌ-চলাচল পুনঃস্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
রুবিওর অবস্থান শুধু যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থের প্রতিফলন নয়; এটি উপসাগরীয় মিত্র রাষ্ট্রগুলোর উদ্বেগকেও সামনে নিয়ে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র আশঙ্কা করছে, যদি ইরান দীর্ঘমেয়াদে নতুন ফি বা প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে, তবে তা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নৌপরিবহনের স্বাধীনতা সীমিত করতে পারে এবং ভবিষ্যতে আরও বড় আঞ্চলিক উত্তেজনার জন্ম দিতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রশ্নে মার্কো রুবিওর দৃঢ় অবস্থান আগামী কয়েক সপ্তাহের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। কারণ শুধু প্রণালীর ভবিষ্যৎ নয়, একই সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, আন্তর্জাতিক পরিদর্শন, মধ্যপ্রাচ্যে বিদেশি সামরিক উপস্থিতি এবং ইরানের জব্দকৃত সম্পদ মুক্ত করার মতো জটিল বিষয়ও আলোচনার টেবিলে রয়েছে। ফলে হরমুজকে ঘিরে বিরোধ কেবল একটি সামুদ্রিক বা অর্থনৈতিক ইস্যু নয়; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের নতুন নিরাপত্তা কাঠামো নির্ধারণের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক লড়াইয়ের অংশ হয়ে উঠেছে।
বিশ্ব এখন নজর রাখছে মার্কো রুবিও, তেহরানের নেতৃত্ব এবং উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। কারণ হরমুজ প্রণালী নিয়ে গৃহীত সিদ্ধান্ত শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিশ্ব অর্থনীতির গতিপথও নির্ধারণ করতে পারে।
ইরানের ট্রানজিট ফি পরিকল্পনায় আপত্তি যুক্তরাষ্ট্রের, কঠোর অবস্থানে রুবিও
