যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন জন্মসূত্রে মার্কিন নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে নতুন করে কঠোর অবস্থান নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। প্রশাসনের প্রস্তাবিত নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া শিশুদের পাসপোর্ট আবেদনের সময় তাদের বাবা-মায়ের নাগরিকত্ব অথবা যুক্তরাষ্ট্রে বৈধ অভিবাসন-স্থিতির প্রমাণ জমা দিতে হতে পারে। বিষয়টি ট্রাম্প প্রশাসনের দীর্ঘদিনের অভিবাসনবিরোধী নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে সামনে এসেছে এবং এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া শিশুদের নাগরিকত্ব নির্ধারণের প্রচলিত প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
হোয়াইট হাউস এ বিষয়ে করা প্রশ্নগুলো মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কাছে পাঠিয়েছে। পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগট এক বিবৃতিতে বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মার্কিন নাগরিকত্বের “অর্থ ও মূল্য” রক্ষার বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থানে রয়েছেন এবং পাসপোর্ট প্রদানের প্রক্রিয়াও সেই নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত। প্রশাসনের এই উদ্যোগ বিশেষভাবে তথাকথিত ‘বার্থ ট্যুরিজম’ বা সন্তানকে মার্কিন নাগরিকত্ব দেওয়ার উদ্দেশ্যে গর্ভবতী নারীদের যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণের বিষয়টিকে লক্ষ্য করে নেওয়া হয়েছে।
জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করা ট্রাম্পের অভিবাসন নীতির অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। এর আগে ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশ জারি করে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া শিশুর স্বয়ংক্রিয় নাগরিকত্ব সীমিত করার চেষ্টা করেছিলেন। সেই আদেশ অনুযায়ী, অন্তত একজন বাবা-মা মার্কিন নাগরিক অথবা বৈধ স্থায়ী বাসিন্দা—অর্থাৎ গ্রিন কার্ডধারী—না হলে শিশুটি জন্মের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় মার্কিন নাগরিকত্ব পাবে না। তবে ওই উদ্যোগ আদালতে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে এবং মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের ৬-৩ সংখ্যাগরিষ্ঠ রায়ে সেটিকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়। আদালতের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতিরা মনে করেন, ওই আদেশ মার্কিন সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীর নাগরিকত্ব ধারার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এরপর গত ৬ আগস্ট ট্রাম্প প্রশাসন তুলনামূলকভাবে সংকীর্ণ পরিসরের আরেকটি নির্বাহী আদেশ জারি করে, যেখানে বিশেষভাবে বার্থ ট্যুরিজমকে লক্ষ্য করা হয়। নতুন নির্দেশনার অধীনে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া কিছু শিশুর নাগরিকত্বের অধিকার সীমিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রস্তাবিত নীতিতে এমন শিশুদের ক্ষেত্রে প্রশ্ন তোলা হয়েছে যাদের বাবা বা মা যুক্তরাষ্ট্রে কোনো বিদেশি সরকারের হয়ে কাজ করেন, নাগরিকত্ব পাওয়ার উদ্দেশ্যে প্রতারণা বা বাণিজ্যিক লেনদেনে জড়িত বলে বিবেচিত হন, অথবা যাদের অভিভাবককে ‘alien enemy’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের খসড়া নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কোনো শিশু নতুন নির্বাহী আদেশের আওতায় পড়ে কি না তা নির্ধারণের জন্য পাসপোর্ট আবেদনের সময় বাবা-মায়ের তথ্য এবং তাদের নাগরিকত্ব বা অভিবাসন-স্থিতির প্রমাণ চাওয়া হতে পারে। এর অর্থ হলো, বর্তমানে যে পাসপোর্ট আবেদন প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া শিশুর বাবা-মায়ের পরিচয় ও ছবি-সংবলিত পরিচয়পত্র উপস্থাপন করাই মূলত প্রয়োজন, সেখানে ভবিষ্যতে অতিরিক্ত নথিপত্র জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হতে পারে।
প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে বাবা-মা বা আইনগত অভিভাবকদের নিজেদের নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে বৈধ মার্কিন পাসপোর্ট বা জন্মসনদ এবং অভিবাসন-স্থিতির প্রমাণ হিসেবে I-94 ফর্ম, গ্রিন কার্ড বা সংশ্লিষ্ট নথি জমা দিতে হতে পারে। এসব তথ্য ব্যবহার করে সরকার শিশুটি নতুন নির্বাহী আদেশের আওতায় নাগরিকত্বের জন্য যোগ্য কি না তা নির্ধারণ করবে।
তবে প্রশাসনের এই পদক্ষেপ ইতোমধ্যেই আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। যেসব শিশু ট্রাম্পের আগের নির্বাহী আদেশের আওতায় নাগরিকত্ব হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে, তাদের পক্ষে দায়ের করা শ্রেণিভিত্তিক মামলার আইনজীবীরা নতুন নির্দেশনাটিও কার্যকর হওয়া ঠেকাতে পৃথক ফেডারেল আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। এর মধ্যে একটি মামলা মেরিল্যান্ডের গ্রিনবেল্টে মার্কিন জেলা বিচারক ডেবোরাহ বোর্ডম্যানের আদালতে চলছে। বোর্ডম্যান, যিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সময়ে নিয়োগ পেয়েছিলেন, শুনানিতে ট্রাম্পের আদেশকে নজিরবিহীন বলে অভিহিত করে এর সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং বাদীপক্ষকে তাদের মামলা সংশোধনের অনুমতি দেন, যাতে আদালত নির্বাহী আদেশটি স্থগিত করার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে।
অন্যদিকে মার্কিন বিচার বিভাগ যুক্তি দিয়েছে যে, এই পর্যায়ে কোনো restraining order বা সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করা যথাযথ হবে না। সরকারের আইনজীবীদের দাবি, ফেডারেল সংস্থাগুলো এখনো নির্বাহী নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য আনুষ্ঠানিক জনসাধারণের নির্দেশনা প্রকাশ করেনি; ফলে আইনি চ্যালেঞ্জটি এখনও অকালপক্ব।
ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন উদ্যোগ এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসননীতি, জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব এবং প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতার সীমা নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। একদিকে প্রশাসন বলছে, মার্কিন নাগরিকত্বের মর্যাদা ও আইনি কাঠামো রক্ষার জন্য পাসপোর্ট যাচাই প্রক্রিয়ায় কঠোরতা প্রয়োজন; অন্যদিকে অধিকারকর্মী ও মামলাকারীদের বক্তব্য হলো, সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীতে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের যে সাংবিধানিক নিশ্চয়তা রয়েছে, প্রশাসনিক নির্দেশনার মাধ্যমে তা সীমিত করা হলে তা আবারও দীর্ঘস্থায়ী আইনি সংঘাত সৃষ্টি করতে পারে।
ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের সর্বশেষ পদক্ষেপ এখন কেবল অভিবাসন নীতির প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই; এটি মার্কিন সংবিধান, প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা এবং যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া শিশুদের নাগরিকত্বের সাংবিধানিক অধিকারের ভবিষ্যৎ নিয়েও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। প্রস্তাবিত পাসপোর্ট-নিয়ম বাস্তবায়িত হবে কি না এবং আদালত এর সাংবিধানিক বৈধতা কীভাবে মূল্যায়ন করবে—সেদিকেই এখন নজর রয়েছে।
