গাজা যুদ্ধের অবসান, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং উপত্যকার ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা নিয়ে সৃষ্ট কূটনৈতিক অচলাবস্থা কাটাতে নতুন করে সক্রিয় হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র; মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা ও মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক প্রভাবশালী কূটনৈতিক মধ্যস্থতাকারী জ্যারেড কুশনার সোমবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করেছেন, যেখানে ইসরায়েল ইতোমধ্যে প্রত্যাখ্যান করা ১৫ দফা গাজা পরিকল্পনাকে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে; এই বৈঠকের আগে কুশনার মিসরের এল-আলামেইনে কাতার, তুরস্ক ও মিসরের মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং তার সঙ্গে ছিলেন ‘বোর্ড অব পিস’-এর মহাপরিচালক নিকোলাই ম্লাদেনভ ও সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার; কূটনৈতিক তৎপরতার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, কুশনার এর আগে হামাসের রাজনৈতিক নেতৃত্বের কয়েকজন সদস্যের সঙ্গেও বিরল বৈঠক করেছেন, যার লক্ষ্য ছিল প্রস্তাবিত রূপরেখার বিভিন্ন প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবায়নযোগ্য ও যাচাইযোগ্য পদক্ষেপে রূপ দেওয়া; যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ‘বোর্ড অব পিস’ ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে গঠিত হয় এবং এতে ইসরায়েলসহ প্রায় ৪০টি দেশ যুক্ত রয়েছে, যদিও ফিলিস্তিনি কোনো প্রতিনিধি এতে অন্তর্ভুক্ত নেই; জুলাইয়ের শেষ দিকে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে একটি সমঝোতা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়নের পর্যায়ে এসে পরিকল্পনাটি বড় ধরনের বাধার মুখে পড়েছে; পরিকল্পনার মূল কাঠামো অনুযায়ী হামাস ধাপে ধাপে অস্ত্র ত্যাগ করবে, গাজার প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ একটি আন্তর্জাতিক বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করবে এবং এর বিনিময়ে ইসরায়েলি বাহিনী গাজা থেকে প্রত্যাহার করবে; কিন্তু নেতানিয়াহু প্রকাশ্যে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছেন, হামাসকে সম্পূর্ণভাবে নিরস্ত্র না করা পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনী গাজা থেকে সরে যাবে না; অন্যদিকে হামাস জানিয়েছে, তারা পরিকল্পনাটি গ্রহণ করতে প্রস্তুত থাকলেও বাস্তবায়ন নির্ভর করবে ইসরায়েলের নিজস্ব প্রতিশ্রুতি পূরণের ওপর, বিশেষ করে গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং সামরিক হামলা বন্ধের ওপর; ফলে উভয় পক্ষের অবস্থানের মধ্যকার এই মৌলিক ব্যবধানই বর্তমানে যুদ্ধবিরতি-পরবর্তী রাজনৈতিক সমাধানের সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে; কুশনারের ধারাবাহিক মিসর-ইসরায়েল কূটনৈতিক সফর তাই শুধু একটি নতুন মধ্যস্থতা প্রচেষ্টা নয়, বরং ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেতানিয়াহুর কঠোর অবস্থান পরিবর্তনের জন্য সরাসরি চাপ সৃষ্টির ইঙ্গিত হিসেবেও দেখা হচ্ছে; বিশেষ করে অক্টোবরে ইসরায়েলের সম্ভাব্য নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহু অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছেন এবং গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার বা হামাসের সঙ্গে আপসের প্রশ্নে তার অবস্থান রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল; একই সময়ে হামাসের পক্ষ থেকেও নিরস্ত্রীকরণ প্রশ্নে শর্ত আরোপ করা হয়েছে, ফলে যুদ্ধবিরতির পর গাজার নিরাপত্তা, প্রশাসন, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে নতুন করে কঠিন দরকষাকষি শুরু হয়েছে; ২০২৫ সালের শেষ দিকে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে ঘোষিত যুদ্ধবিরতির ভিত্তিতে গঠিত ‘বোর্ড অব পিস’ এখন সেই চুক্তিকে একটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কাঠামোয় রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও গাজায় ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১,২৬০ ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার তথ্য পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করছে; ফলে কুশনারের নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক এবং হামাসের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ—দুই দিকের এই সমান্তরাল কূটনৈতিক তৎপরতা গাজা সংকটের পরবর্তী অধ্যায়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও, ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ, গাজার শাসনভার এবং আন্তর্জাতিক বাহিনীর কাঠামো নিয়ে সমঝোতা না হলে এই উদ্যোগও দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পথ খুলতে পারবে কি না, তা নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
