ভারতের নয়া দিল্লিতে ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এক সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কড়া ভাষায় অবস্থান তুলে ধরে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আবাঘচি অভিযোগ করেছেন, ওয়াশিংটন ও তেল আবিব ইরানের বিরুদ্ধে ‘বর্বর ও বেআইনি আগ্রাসন’ চালাচ্ছে এবং তেহরান কখনোই সাম্রাজ্যবাদী চাপের কাছে মাথা নত করবে না। তিনি ব্রিকস সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এ যুদ্ধ শুধু তেহরানের একার নয়, বরং পুরো গ্লোবাল সাউথের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম। আরাকচির ভাষায়, “ইরান সবার হয়ে লড়ছে—একটি নতুন বিশ্ব ব্যবস্থার জন্য, যা আমরা সবাই মিলে গড়ে তুলছি। আমাদের সৈন্যরা পশ্চিমা আধিপত্য ও যুক্তরাষ্ট্রের দায়মুক্তির সংস্কৃতির বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে জীবন দিয়েছে।” এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি গত এক বছরে ইরানের ওপর চালানো দুই দফা হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেন, এসব হামলা মিথ্যা অভিযোগের ভিত্তিতে হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক আনবিক শক্তি কমিশন ও যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা মূল্যায়নের সঙ্গেও সেসব অভিযোগের মিল নেই। আবেগঘন বক্তব্যে মিনাবে স্কুলে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় নিহত শিশুদের মায়েদের স্মরণ করে তিনি বলেন, “তারা সন্তান হারিয়েও মাথা নত করেননি।” একইসঙ্গে স্বাস্থ্যকর্মী, শিক্ষক ও সৈন্যদের ত্যাগের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। ইরান তার আদর্শ থেকে সরে এসেছে কি না—এ প্রশ্ন তুলে আরাকচি বলেন, “আমরা কখনোই সাম্রাজ্যবাদের কাছে নতি স্বীকার করিনি, ভবিষ্যতেও করব না।” তিনি আরও বলেন, “পতনোন্মুখ সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো ঘড়ির কাঁটা উল্টে দিতে চায়, তাই তারা মরিয়া হয়ে আগ্রাসী আচরণ করছে।” ব্রিকসকে তুলনামূলকভাবে বেশি ন্যায়ভিত্তিক বিশ্ব ব্যবস্থার প্রতিনিধি আখ্যা দিলেও জোটটির অবস্থান এখনো নড়বড়ে বলে মন্তব্য করেন তিনি। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতি সংহতির আহ্বান জানিয়ে আরাকচি বলেন, “এই কক্ষে উপস্থিত প্রায় সব দেশই কোনো না কোনোভাবে যুক্তরাষ্ট্রের জবরদস্তিমূলক নীতির শিকার।” তিনি ব্রিকস সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানান, যেন তারা ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ‘বেআইনি আগ্রাসন’ এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় কঠোর নিন্দা ও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়। পশ্চিমা দেশগুলোর নীরবতার সমালোচনা করে তিনি অভিযোগ করেন, “গণহত্যা, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন ও আন্তর্জাতিক জলসীমায় প্রকাশ্য জলদস্যুতার ঘটনায় চুপ থেকে তারা দায়মুক্তির সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করছে।” একইসঙ্গে তিনি বলেন, ইরান এখনো কূটনৈতিক সমাধানকে গুরুত্ব দেয় এবং সম্মানজনক আচরণের জবাব সম্মানের সঙ্গেই দেবে। “ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো ইস্যুর সামরিক সমাধান নেই। আমরা চাপ বা হুমকির কাছে নত হব না, তবে সম্মানজনক ভাষায় কথা বলা হলে সেভাবেই জবাব দেব,” বলেন তিনি। ইরানের জনগণ শান্তিপ্রিয় এবং তেহরান ‘আক্রান্ত, আক্রমণকারী নয়’ বলেও দাবি করেন আরাকচি। এনডিটিভির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ব্রিকস সম্মেলনে তার এমন অবস্থান বর্তমান চেয়ার দেশ ইন্ডিয়া-কে কূটনৈতিকভাবে অস্বস্তিতে ফেলতে পারে, কারণ নয়াদিল্লি একদিকে সংলাপের পক্ষে থাকলেও অন্যদিকে ইরান ও পশ্চিমা শক্তিগুলোর সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রেখে চলছে। ফলে ভারতের জন্য সরাসরি কোনো পক্ষ নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, আরাকচির এই বক্তব্যের পর এবারের ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে পশ্চিম এশিয়ার উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিই আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসবে ।
