ওয়াশিংটন | আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের সংঘাত নিরসনের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটনে ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যা দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা কমানোর পথে একটি ঐতিহাসিক সূচনা হিসেবে বিবেচিত হলেও এর বাস্তবায়ন, হিজবুল্লাহর অবস্থান এবং সীমান্ত পরিস্থিতির কারণে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা নিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে এখনো গভীর সংশয় রয়ে গেছে। শুক্রবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে আয়োজিত আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, লেবাননের রাষ্ট্রদূত নাদা মাওয়াদ, ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ইয়েখিয়েল লাইটার এবং মার্কিন প্রতিনিধিরা এই ত্রিপক্ষীয় চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। অনুষ্ঠানে মার্কো রুবিও বলেন, “এটি কেবল শুরু। প্রকৃত শান্তির পথে এখনও বহু কঠিন ধাপ অতিক্রম করতে হবে, আর প্রথম পদক্ষেপটিই সবসময় সবচেয়ে কঠিন।” মার্কিন প্রশাসনের ভাষ্যমতে, এই চুক্তির মূল লক্ষ্য হচ্ছে লেবাননের সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা, দেশের সর্বত্র লেবাননের সেনাবাহিনীর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, হিজবুল্লাহসহ অরাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নিরস্ত্রীকরণ, তাদের সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস এবং পরবর্তীতে ধাপে ধাপে ইসরায়েলি বাহিনীর সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে প্রত্যাহার নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্যে ‘লেবাননের জন্য সামরিক সমন্বয় গ্রুপ’ নামে একটি ত্রিপক্ষীয় কাঠামো গঠন করা হবে, যা চুক্তির প্রতিটি ধাপ পর্যবেক্ষণ ও বাস্তবায়নের অগ্রগতি তদারকি করবে। চুক্তির আওতায় প্রথম পর্যায়ে দুটি ‘পাইলট জোন’ নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখানে ইসরায়েলি বাহিনী ধাপে ধাপে সরে যাবে এবং লেবাননের সেনাবাহিনী নিরাপত্তার পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করবে। সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে অরাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর কার্যক্রম সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হওয়ার পর আন্তর্জাতিক সহায়তায় পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরু হবে এবং যুদ্ধের কারণে বাস্তুচ্যুত লাখো মানুষ নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পাবে। তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্পষ্ট করে দিয়েছেন, হিজবুল্লাহ সম্পূর্ণ নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সেনা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হবে না। চুক্তি বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের সমন্বয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ১০ কোটি ডলারের মানবিক সহায়তা এবং লেবাননের সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য অতিরিক্ত ৩ কোটি ডলারেরও বেশি সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম বলেছেন, এই চুক্তির মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ইসরায়েলের দখলে থাকা সব লেবানিজ ভূখণ্ড থেকে সেনা প্রত্যাহার নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রের পূর্ণ কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনও একে দেশের সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং আশা প্রকাশ করেছেন যে এর মাধ্যমে বাস্তুচ্যুত মানুষের নিজ নিজ এলাকায় ফিরে যাওয়ার পথ উন্মুক্ত হবে। তবে চুক্তির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে হিজবুল্লাহর কঠোর বিরোধিতা। সংগঠনটি আলোচনায় অংশ না নিলেও বাস্তব পরিস্থিতিতে তাদের অবস্থানই চুক্তির সফলতা বা ব্যর্থতার অন্যতম প্রধান নির্ধারক বলে মনে করা হচ্ছে। হিজবুল্লাহ বরাবরই দাবি করে আসছে, কোনো শর্ত ছাড়াই ইসরায়েলকে লেবাননের ভূখণ্ড ত্যাগ করতে হবে। সংগঠনটির মহাসচিব নাঈম কাসেম ইসরায়েলের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছেন। অন্যদিকে হিজবুল্লাহর সংসদ সদস্য হাসান ফাদলাল্লাহ সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে লেবাননের সেনাবাহিনী যদি বলপ্রয়োগের মাধ্যমে এই চুক্তি বাস্তবায়নের চেষ্টা করে, তাহলে দেশটি গৃহযুদ্ধের দিকে ধাবিত হতে পারে এবং হিজবুল্লাহ তাদের অস্ত্র আরও দৃঢ়ভাবে ধরে রাখবে। এদিকে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া সংঘাতে দক্ষিণ লেবাননের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। রাজধানী বৈরুত ও বেকা উপত্যকাসহ বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক বিমান হামলায় চার হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত এবং ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। যুদ্ধবিরতির পর সংঘাত কিছুটা কমলেও ইসরায়েল এখনও লেবাননের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এলাকা নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। এমনকি চুক্তি স্বাক্ষরের দিনও দক্ষিণ লেবাননের মায়ফাদুন এলাকায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় দুইজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে এবং নাবাতিয়েহ আল-ফাওকা এলাকায়ও নতুন হামলা চালানো হয়েছে। একই সঙ্গে মানসৌরি শহরে ইসরায়েলি বাহিনী লিফলেট ফেলে স্থানীয় বাসিন্দাদের এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। ইসরায়েল এসব এলাকাকে নিজেদের নিরাপত্তা বলয়ের অংশ হিসেবে উল্লেখ করে বলছে, এখান থেকে হিজবুল্লাহর সম্ভাব্য হামলা প্রতিরোধ করাই তাদের উদ্দেশ্য। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন এই কাঠামোগত চুক্তি সংঘাত কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক উদ্যোগ হলেও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে এখনো বড় ধরনের রাজনৈতিক, সামরিক ও নিরাপত্তাগত বাধা বিদ্যমান। কারণ একদিকে ইসরায়েল ও লেবানন রাষ্ট্র হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে বৈরিতার মধ্যে রয়েছে, অন্যদিকে হিজবুল্লাহ একটি শক্তিশালী স্বাধীন সশস্ত্র সংগঠন হিসেবে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে। যদিও চুক্তিতে ইসরায়েল আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে যে লেবাননের ভূখণ্ডে তাদের কোনো স্থায়ী ভৌগোলিক দাবি নেই, তবুও দেশটির কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা, বিশেষ করে অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচ, দীর্ঘমেয়াদে সীমান্ত এলাকায় ইসরায়েলি উপস্থিতি বজায় রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন এই কূটনৈতিক অগ্রগতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আশার আলো তৈরি করলেও, বাস্তবতার কঠিন পরীক্ষায় এটি স্থায়ী শান্তির ভিত্তি গড়তে পারবে কি না, তার উত্তর সময়ই দেবে।
