সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যে টেলিফোনে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে, যেখানে সিরিয়ায় রাশিয়ার কৌশলগত সামরিক উপস্থিতি, দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। বুধবারের ওই ফোনালাপে পুতিন সিরিয়ার ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি মস্কোর সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন এবং সিরিয়ার ভূখণ্ডে ইসরায়েলি হামলা ও সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের বিরোধিতা করেন বলে সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা SANA জানিয়েছে। একই সঙ্গে ক্রেমলিন জানিয়েছে, দুই নেতা রাজনৈতিক সংলাপ আরও গভীর করা, বাণিজ্যিক সহযোগিতা বাড়ানো এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন কাঠামো গড়ে তোলার বিষয়েও আলোচনা করেছেন। তবে আলোচনার সবচেয়ে কৌশলগত দিক হিসেবে সামনে এসেছে ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে অবস্থিত রাশিয়ার খমেইমিম বিমানঘাঁটি ও তারতুস নৌঘাঁটির ভবিষ্যৎ। সিরিয়ায় দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র বাশার আল-আসাদের পতনের পর মস্কো ও দামেস্কের সম্পর্ক একটি নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে; তবুও রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যে তার সামরিক ও কৌশলগত প্রভাব ধরে রাখতে এই দুটি স্থাপনাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করে। ক্রেমলিনের ভাষ্য অনুযায়ী, দুই পক্ষ ৯ আগস্ট স্বাক্ষরিত খমেইমিম বিমানঘাঁটি ও তারতুসের উপকরণ-প্রযুক্তিগত সহায়তা কেন্দ্র পুনর্গঠনসংক্রান্ত সমঝোতা স্মারকের গুরুত্বও তুলে ধরেছে। সিরিয়া এর আগে জানিয়েছিল, প্রায় ১৮ মাসের আলোচনার পর মস্কোর সঙ্গে একটি সমঝোতা হয়েছে, যার আওতায় খমেইমিম ও তারতুসকে যৌথ প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির কেন্দ্রে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে এবং উভয় ঘাঁটির বেসামরিক স্থাপনাগুলোর নিয়ন্ত্রণ সিরিয়ার হাতে দেওয়ার কথা রয়েছে। এই সমঝোতা রাশিয়ার জন্য সরাসরি সামরিক ঘাঁটি পরিচালনার পুরোনো কাঠামো থেকে একটি নতুন, অপেক্ষাকৃত নমনীয় ব্যবস্থায় যাওয়ার ইঙ্গিত দিতে পারে; একই সঙ্গে দামেস্কের জন্য এটি রুশ সহযোগিতা বজায় রেখে নিজের সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ আরও দৃঢ় করার সুযোগ তৈরি করছে। সিরিয়ার ১৩ বছরের গৃহযুদ্ধের সময় রাশিয়া বাশার আল-আসাদ সরকারকে সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে সমর্থন করেছিল এবং ২০১৫ সালে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের পর খমেইমিম বিমানঘাঁটি ও তারতুস নৌঘাঁটিকে কেন্দ্র করে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে নিজেদের উপস্থিতি ব্যাপকভাবে শক্তিশালী করে। খমেইমিম রুশ বিমান অভিযান ও সামরিক সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, আর তারতুস ভূমধ্যসাগরে রাশিয়ার নৌ-লজিস্টিক সক্ষমতার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু আল-শারার নেতৃত্বে আসাদ সরকারের পতনের পর সিরিয়ার রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে যাওয়ায় মস্কোকে নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন করতে হয়েছে। পুতিন একদিকে আল-আসাদকে দীর্ঘদিনের মিত্র হিসেবে সমর্থন করার ঐতিহ্য বজায় রেখেছেন, অন্যদিকে নতুন সিরীয় নেতৃত্বের সঙ্গে বাস্তববাদী কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। এর ফলে রাশিয়া-সিরিয়া সম্পর্ক এখন আর কেবল পুরোনো রাজনৈতিক আনুগত্যের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং সামরিক ঘাঁটি, নিরাপত্তা, বাণিজ্য, আঞ্চলিক প্রভাব এবং সিরিয়ার সার্বভৌমত্ব—সবকিছুকে ঘিরে একটি নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে ইসরায়েলের সঙ্গে সিরিয়ার সম্পর্ক, সিরিয়ার ভূখণ্ডে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা মস্কো-দামেস্ক আলোচনাকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। রাশিয়া যদি খমেইমিম ও তারতুসে তার উপস্থিতি কোনো নতুন যৌথ কাঠামোর অধীনে ধরে রাখতে পারে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে মস্কোর দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অবস্থান অনেকাংশে অক্ষুণ্ন থাকবে; অন্যদিকে সিরিয়া যদি এসব স্থাপনার বেসামরিক ও সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তাহলে নতুন সরকার তার স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিতে পারবে। এই বাস্তবতায় পুতিন ও আল-শারার সাম্প্রতিক ফোনালাপকে শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নিয়মিত যোগাযোগ হিসেবে দেখার সুযোগ কম; বরং এটি আসাদ-পরবর্তী সিরিয়ায় রাশিয়ার ভবিষ্যৎ ভূমিকা নির্ধারণ এবং মধ্যপ্রাচ্যে মস্কোর কৌশলগত উপস্থিতি পুনর্গঠনের বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ। ক্রেমলিন জানিয়েছে, দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ অব্যাহত থাকবে—যা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে খমেইমিম ও তারতুসের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা এখনও শেষ হয়নি এবং রাশিয়া ও সিরিয়া তাদের নতুন সম্পর্কের কাঠামো ধীরে ধীরে নির্ধারণ করছে। ফলে আগামী দিনগুলোতে এসব ঘাঁটির কার্যক্রম, রুশ সামরিক উপস্থিতির মাত্রা এবং সিরিয়ার সঙ্গে মস্কোর নিরাপত্তা সহযোগিতার প্রকৃতি শুধু দুই দেশের সম্পর্কের জন্য নয়, বরং পূর্ব ভূমধ্যসাগর ও বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
