মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সামরিক ও কৌশলগত সংঘাত এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থান থেকে পিছিয়ে আসার পরিবর্তে সংঘাত আরও বিস্তৃত করার পথে এগোতে পারে বলে আশঙ্কা বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলতে গিয়ে যুদ্ধের পরিসর বাড়িয়ে তোলার কৌশল শেষ পর্যন্ত পুরো অঞ্চলকে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিতে পারে। বিশেষ করে ইরানের তেল রপ্তানির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর চাপ ও অবরোধ অব্যাহত থাকলে তেহরানের সামনে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল ব্যাহত করা এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি রপ্তানিকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার প্রণোদনা আরও শক্তিশালী হতে পারে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালিতে যেকোনো দীর্ঘস্থায়ী সংকট বৈশ্বিক তেলবাজার, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতির ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছেন, যদি এই অঞ্চলে ইরান তার তেল বিক্রি করতে না পারে, তাহলে অন্য কোনো দেশও নির্বিঘ্নে তেল রপ্তানি করতে পারবে না। তাঁর এই মন্তব্যকে অনেক পর্যবেক্ষক ইরানের সম্ভাব্য কৌশলগত অবস্থানের স্পষ্ট ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। একই সময়ে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, যে দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীকে ঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ দেবে, তাদেরও সম্ভাব্য পাল্টা প্রতিক্রিয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। এর ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক মিত্রদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের ওপর সামরিক হামলা এবং অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখে, তাহলে তেহরান তার প্রতিক্রিয়ার পরিধি আরও বাড়াতে পারে। এর মধ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর সক্রিয়তা বৃদ্ধি এবং গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরির মতো পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। অন্যদিকে ওয়াশিংটনের লক্ষ্য হচ্ছে অর্থনৈতিক অবরোধ, তেল রপ্তানি সীমিতকরণ এবং ধারাবাহিক সামরিক চাপের মাধ্যমে ইরানকে কৌশলগতভাবে দুর্বল করে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনা। তবে সমালোচকদের মতে, এই কৌশল প্রত্যাশিত ফল না এনে বরং সংঘাতকে আরও জটিল ও বিস্তৃত করে তুলতে পারে।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সামান্য ভুল হিসাব বা সীমিত সামরিক প্রতিক্রিয়াও দ্রুত পূর্ণমাত্রার আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। হরমুজ প্রণালি, লোহিত সাগর এবং উপসাগরীয় জ্বালানি অবকাঠামোকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে তার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, বাণিজ্য, পরিবহন ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপরও তা সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে কূটনৈতিক সমাধানের পথ সংকুচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন করে বড় আকারের আঞ্চলিক সংঘাতের আশঙ্কাও ক্রমশ জোরালো হয়ে উঠছে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে কূটনীতির পথ সংকুচিত, বাড়ছে বৃহত্তর যুদ্ধের আশঙ্কা
