মিয়ানমারের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে গবেষণাকারী মার্কিন নাগরিক ও বিশ্লেষক মিন জিনকে আটকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ওয়াশিংটন মিন জিনের আটককে ‘অন্যায়ভাবে আটক’ হিসেবে চিহ্নিত করে তার মুক্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ঘোষণা দিলেও বেইজিং সেই অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শুক্রবার জানিয়েছে, মিন জিন চীনের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার সন্দেহে আটক রয়েছেন এবং তার বিরুদ্ধে চীনের আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বলেন, চীন আইনের শাসন দ্বারা পরিচালিত একটি দেশ এবং সেখানে ‘অন্যায়ভাবে আটক’ বলে কোনো বিষয় নেই। বেইজিংয়ের এই অবস্থান এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বাণিজ্য, প্রযুক্তি, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতপার্থক্য কমিয়ে সম্পর্ক স্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বৃহস্পতিবার মিন জিনের আটককে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘অন্যায়ভাবে আটক’ হিসেবে চিহ্নিত করে। এর ফলে তার মুক্তি নিশ্চিত করাকে ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক অগ্রাধিকারের মধ্যে আনা হয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, মিন জিন গত ৩ জুন চীনের ইউনান প্রদেশে একটি শিক্ষাবিষয়ক সম্মেলনে অংশ নিতে গিয়েছিলেন এবং চীনা সরকারের আমন্ত্রণেই সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন। পরে তাকে আটক করা হয়। মিন জিন মিয়ানমারের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সম্পদ-সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে গবেষণা করা একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। প্রতিষ্ঠানটি ২০২১ সালে মিয়ানমারের সামরিক অভ্যুত্থানের পর শুরু হওয়া দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে গবেষণা করে। তার আটককে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ আরও বেড়েছে, কারণ তিনি এর আগে থাইল্যান্ডে বসবাস করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্র ও মিয়ানমারেও সময় কাটিয়েছেন। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এক বিবৃতিতে বলেছে, মার্কিন নাগরিকদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার এবং চীনে নির্বিচারে আটক বা দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা মার্কিন নাগরিকদের মুক্তির জন্য তারা কাজ অব্যাহত রাখবে। অন্যদিকে, চীনের বক্তব্য অনুযায়ী, মিন জিনের বিরুদ্ধে জাতীয় নিরাপত্তা বিপন্ন করতে পারে এমন কর্মকাণ্ডের সন্দেহ রয়েছে। তবে তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা বিচারপ্রক্রিয়ার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি। ঘটনাটি চীন–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের জন্য বিশেষভাবে সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে, কারণ আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের হোয়াইট হাউস সফরের পরিকল্পনা রয়েছে। এর আগে মে মাসে বেইজিংয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের মধ্যে শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। দুই দেশের নেতারা সম্পর্কের উত্তেজনা কমানো এবং বাণিজ্য ও অন্যান্য কৌশলগত বিষয়ে সমঝোতার পথ খুঁজলেও মিন জিনের আটক নতুন করে মানবাধিকার, আইনের শাসন ও মার্কিন নাগরিকদের নিরাপত্তার প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। চীন ও মিয়ানমারের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে এবং মিয়ানমারের সামরিক প্রশাসনের ওপর বেইজিংয়ের উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে বলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। মিয়ানমারের সামরিক প্রশাসনকে সমর্থনের পাশাপাশি চীনের বিরুদ্ধে দেশটির বিভিন্ন সশস্ত্র সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার অভিযোগও রয়েছে, যদিও বেইজিং এসব বিষয়ে নিজস্ব নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলে থাকে। মিন জিনের ঘটনা তাই শুধু একজন মার্কিন নাগরিকের আটক নিয়ে বিরোধ নয়; এটি চীন–যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেও নতুন একটি সংবেদনশীল বিষয় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। চীনে ভুলভাবে আটক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের তালিকাভুক্ত দ্বিতীয় মার্কিন নাগরিক হলেন মিন জিন। এর আগে ২০২৪ সালে বোস্টনের চীনা-আমেরিকান ভূকম্পবিদ ইউলিন চেনকে চীনা কর্তৃপক্ষ আটক করেছিল। চেনের স্ত্রী ইউফাং রং বলেছেন, মিন জিনকে অন্যায়ভাবে আটক হিসেবে চিহ্নিত করার ঘটনা প্রমাণ করে যে আটক ব্যক্তিদের স্বাধীনতা ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার পেয়েছে। ফলে শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য ওয়াশিংটন সফরের আগে মিন জিনের আটক বিষয়টি দুই দেশের কূটনৈতিক আলোচনায় কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের অন্যতম নজরদারির বিষয়। বাণিজ্য ও প্রযুক্তি থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার নিরাপত্তা—বহুমাত্রিক প্রতিযোগিতার মধ্যে এই ঘটনা ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টার সামনে নতুন একটি কূটনৈতিক পরীক্ষা তৈরি করেছে।
