তেহরান — ইরানের কুদস ফোর্সের কমান্ডার ইসমাইল কায়ানি ইয়েমেনের ওপর দীর্ঘদিন ধরে চলা অবরোধ অবিলম্বে প্রত্যাহারের জন্য সৌদি আরবের প্রতি কঠোর আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের ওপর আরোপিত দীর্ঘমেয়াদি চাপ ও বিধিনিষেধ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং এটি একটি মানবিক সংকটকে আরও গভীর করেছে। কায়ানি দাবি করেন, ইয়েমেনের জনগণের ওপর চলমান নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা কোনো রাজনৈতিক ছাড় নয়, বরং এটি তাদের মৌলিক মানবিক অধিকার।
ইরানের এই সামরিক কর্মকর্তার বক্তব্যে ইয়েমেন যুদ্ধ, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কায়ানি সৌদি আরবের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, অতীতের সামরিক নীতি ও সংঘাতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ইয়েমেনের জনগণের জন্য নতুন মানবিক ও রাজনৈতিক পথ খুঁজে বের করা প্রয়োজন।
তিনি অভিযোগ করেন, দীর্ঘ সময় ধরে চলা অবরোধের কারণে ইয়েমেনের লাখ লাখ মানুষ খাদ্য, ওষুধ, জ্বালানি ও মৌলিক পরিষেবার সংকটে পড়েছে। তার মতে, একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের জনগণের ওপর এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকা আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর।
কায়ানি সৌদি আরবের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পরিচয়ের বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, দেশটি নিজেকে দুই পবিত্র মসজিদের খাদেম হিসেবে উপস্থাপন করে। তাই মুসলিম বিশ্বের অনেক মানুষের প্রত্যাশা, সৌদি আরব যুদ্ধ ও সংঘাতের পরিবর্তে মানবিক সহায়তা, শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং নিপীড়িত জনগণের পাশে দাঁড়ানোর ভূমিকা পালন করবে।
তিনি একই সঙ্গে গাজা পরিস্থিতির প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, ফিলিস্তিনি জনগণের দুর্ভোগ মোকাবিলা এবং মানবিক সহায়তায় আঞ্চলিক দেশগুলোর আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। তার বক্তব্যে ইয়েমেন ও ফিলিস্তিন—দুই সংকটকেই মুসলিম বিশ্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মানবিক ইস্যু হিসেবে তুলে ধরা হয়।
তবে সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, ইয়েমেনে তাদের অভিযান ও নীতির মূল লক্ষ্য ছিল হুথি আন্দোলনের সামরিক সক্ষমতা মোকাবিলা করা এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন করা। রিয়াদ অভিযোগ করে আসছে, হুথি গোষ্ঠী ইরানের সমর্থন পেয়ে সৌদি আরব ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করেছে।
ইয়েমেনের সংঘাত ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সামরিক হস্তক্ষেপের পর আরও জটিল আকার ধারণ করে। কয়েক বছর ধরে চলা যুদ্ধ দেশটিতে ভয়াবহ মানবিক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বারবার সতর্ক করেছে যে, যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনে সাধারণ মানুষ খাদ্য সংকট, স্বাস্থ্য সমস্যা এবং বাস্তুচ্যুতির মতো বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
ইরান ও সৌদি আরবের সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে কূটনৈতিকভাবে কিছুটা উন্নতির দিকে গেলেও ইয়েমেন, সিরিয়া, ইরাক ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য এখনো রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইয়েমেন ইস্যু মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যেখানে ইরান, সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির স্বার্থ জড়িত।
ইসমাইল কায়ানির এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন সংঘাত, সামরিক উত্তেজনা ও কূটনৈতিক পুনর্বিন্যাস চলছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, ইয়েমেনের অবরোধ ও যুদ্ধ পরিস্থিতির সমাধান শুধু সামরিক পদক্ষেপে নয়, বরং রাজনৈতিক সমঝোতা, মানবিক সহায়তা বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে সহযোগিতার ওপর নির্ভর করবে।
ইয়েমেন অবরোধ প্রত্যাহারের আহ্বান, সৌদি আরবকে ইসমাইল কায়ানির কঠোর বার্তা
