ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা দেশগুলোর বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। ট্রাম্পের লক্ষ্য হলো ইরানের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথগুলো সংকুচিত করা, তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত করা এবং দেশটির আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক লেনদেনকে আরও কঠিন করে তোলা। তবে বিশ্লেষকদের মতে, চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে ইরানের গভীরতর অর্থনৈতিক, কৌশলগত ও সামরিক সম্পর্ক থাকায় এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত কঠিন হতে পারে।
ট্রাম্প সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের বিরুদ্ধে তার অর্থনৈতিক অভিযানকে নজিরবিহীন কঠোরতার পর্যায়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, যেসব দেশ ইরানকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকতে সহায়তা করবে, তাদেরও গুরুতর অর্থনৈতিক পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে। তেল পাচার, অর্থ স্থানান্তর, মুদ্রা বিনিময় ব্যবস্থা, জাহাজ নিবন্ধন এবং বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যাওয়ার পথ বন্ধ করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে ওয়াশিংটন।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের এই কৌশলের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে চীন। ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে চীন দীর্ঘদিন ধরে তেহরানের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল কিনে আসছে। বিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইরানের সমুদ্রপথে রপ্তানি করা তেলের প্রায় ৮০ শতাংশই চীন কিনেছিল। ফলে ইরানের অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ানোর ক্ষেত্রে চীনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে চীনের সঙ্গে ইরানের বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সহজ হবে না। কারণ চীনের অনেক তেল শোধনাগার তুলনামূলকভাবে স্বাধীনভাবে পরিচালিত হয় এবং সেগুলোর বড় অংশ মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার ওপর সরাসরি নির্ভরশীল নয়। ফলে ইরানের তেল কেনার কারণে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা গেলেও তা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বরং অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করলে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যকার বিদ্যমান অর্থনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও ইরানের বিরুদ্ধে আরও নিষেধাজ্ঞাকে সমস্যার সমাধানের কার্যকর পথ হিসেবে দেখছে না। বেইজিংয়ের অবস্থান হলো, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে এবং কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক উপায়ে সংকটের সমাধান করতে হবে। একই সঙ্গে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা চলছে। এমন পরিস্থিতিতে ইরানের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করতে গিয়ে চীনের সঙ্গে বড় ধরনের সংঘাতে জড়ানো ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য কৌশলগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
রাশিয়ার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। ইরানের সঙ্গে মস্কোর বাণিজ্যের পরিমাণ চীনের তুলনায় কম হলেও দুই দেশের মধ্যে গত কয়েক বছরে অর্থনৈতিক, সামরিক ও কৌশলগত সহযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে রাশিয়া ও ইরান দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বের একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। এর ফলে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সহযোগিতার ভিত্তি আরও শক্তিশালী হয়েছে। রুশ কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসে দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।
এ ছাড়া নিষেধাজ্ঞার কারণে পশ্চিমা বাজার থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন রাশিয়া ও ইরান নিজেদের মধ্যে বিকল্প বাণিজ্যিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। জ্বালানি বাণিজ্যের পাশাপাশি সামরিক সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি বিনিময়ের অভিযোগও রয়েছে। ইউরোপীয় একটি সরকারি নথির বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, রাশিয়া সমুদ্রপথে ইরানে ড্রোনের যন্ত্রাংশ, গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক উপকরণ পাঠিয়েছে। এসব অভিযোগের কারণে ইরান-রাশিয়া সম্পর্ক শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামরিক দিক থেকেও ওয়াশিংটনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাশিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ফলে মস্কো মার্কিন নেতৃত্বাধীন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোর বাইরে বিকল্প বাণিজ্যিক ও আর্থিক পথ তৈরিতে অনেক দূর এগিয়েছে। এই বাস্তবতায় ইরানের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক ছিন্ন করতে নতুন করে মার্কিন অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের সুযোগ সীমিত হতে পারে।
ইরানও এই পরিস্থিতিকে নিজেদের জন্য বিকল্প অর্থনৈতিক কাঠামো শক্তিশালী করার সুযোগ হিসেবে দেখছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপকে ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেছেন, এ ধরনের নীতি বিশ্ব অর্থনীতি ও বিভিন্ন দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি তৈরি করছে। তেহরান একই সঙ্গে পশ্চিমা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে চীন, রাশিয়া এবং অন্যান্য উদীয়মান শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
এই ক্ষেত্রে ব্রিকস জোট ইরানের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। চীন, রাশিয়া, ভারত, ব্রাজিলসহ বিশ্বের কয়েকটি বড় অর্থনীতির সমন্বয়ে গঠিত এই জোটের মাধ্যমে পশ্চিমা আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরির সম্ভাবনা দেখছে তেহরান। ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর জানিয়েছেন, দেশটি ব্রিকসের নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। একই সঙ্গে ব্রিকস সদস্যদের নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেন এবং দ্বিপক্ষীয় ও ত্রিপক্ষীয় আর্থিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও আগ্রহ প্রকাশ করেছে ইরান।
তবে ইরানের জন্য পরিস্থিতি মোটেও সহজ নয়। যুক্তরাষ্ট্র যদি দেশটির প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার ও আর্থিক সহযোগীদের ওপর সমন্বিত চাপ সৃষ্টি করতে পারে, তাহলে ইরানের বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ, তেল রপ্তানি, ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো যদি ওয়াশিংটনের চাপের কারণে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য সীমিত করতে শুরু করে, তাহলে তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়বে।
ইতোমধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের সঙ্গে অনির্দিষ্টকালের বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইরানের সামরিক বাহিনী সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভূখণ্ডে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে—এমন অভিযোগের পর আবুধাবি এই সিদ্ধান্ত নেয়। ইরানের অর্থনীতির জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশটি দীর্ঘদিন ধরে ইরানের পণ্য আমদানি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ফলে এই পথ সংকুচিত হলে তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়তে পারে।
তবে চীন ও রাশিয়াকে একইভাবে ইরান থেকে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব হবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। যুক্তরাষ্ট্রের হাতে বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষমতা থাকলেও একতরফাভাবে এমন একটি নিষেধাজ্ঞা কাঠামো তৈরি করা কঠিন, যা একই সঙ্গে চীন, রাশিয়া এবং অন্যান্য বড় অর্থনীতিকে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধ করতে বাধ্য করবে। বিশেষ করে রাশিয়া ইতোমধ্যে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে এবং চীন তার নিজস্ব অর্থনৈতিক স্বার্থের ক্ষেত্রে মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে সবসময় অগ্রাধিকার দেয় না।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হলো—ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করতে গিয়ে যেন চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সংঘাত তৈরি না হয়। কারণ ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও কৌশলগত প্রতিযোগিতা এমনিতেই তীব্র। অন্যদিকে ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কও গভীর সংকটে রয়েছে। এই দুই শক্তিকে একযোগে ইরানের বিরুদ্ধে চাপ প্রয়োগে রাজি করানো তাই অত্যন্ত কঠিন হতে পারে।
সব মিলিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন অর্থনৈতিক অভিযান শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দ্বিপক্ষীয় সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; এটি ধীরে ধীরে বৃহত্তর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশে পরিণত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করছে, আর তেহরান চীন, রাশিয়া ও ব্রিকসকেন্দ্রিক বিকল্প অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। ফলে আগামী দিনে ইরানকে ঘিরে নিষেধাজ্ঞা, জ্বালানি বাণিজ্য, আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং এবং বিকল্প অর্থনৈতিক জোটের প্রতিযোগিতা বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তৈরি করতে পারে।
