যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক ও অর্থনৈতিক সংঘাত যখন মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যকে গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে, তখন ইরান নতুন করে সতর্ক করেছে—যেসব দেশ ওয়াশিংটনের কথিত ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’-এ অংশ নেবে, তাদের আর নিরপেক্ষ হিসেবে বিবেচনা করবে না তেহরান। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজায়ির কঠোর বক্তব্যে উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বা বাণিজ্যিক চাপ প্রয়োগে কোনো দেশ যুক্ত হলে তাকে ‘শত্রু’ হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে এবং প্রয়োজনে ইরান সংশ্লিষ্ট দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেবে। রেজায়ির বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর আরও কঠোর অর্থনৈতিক চাপ আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, তেহরানকে অর্থনৈতিকভাবে সহায়তা করার ক্ষেত্রে যেসব দেশ এগিয়ে আসবে, তাদেরও বড় ধরনের অর্থনৈতিক পরিণতির মুখোমুখি হতে হতে পারে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সামরিক সংঘাত ক্রমেই একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক মুখোমুখি অবস্থানে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা বিশেষভাবে উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোকে সতর্ক করে বলেছেন, তারা যদি ওয়াশিংটনের অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের উদ্যোগে অংশ নেয়, তাহলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে। এই হুমকির তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর, কারণ হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক করিডোর এবং স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস সরবরাহের একটি বড় অংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরান দীর্ঘদিন ধরেই হরমুজকে তার কৌশলগত চাপ প্রয়োগের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছে, আর বর্তমান সংঘাতে প্রণালিটি কার্যত আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও সামুদ্রিক নিরাপত্তার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। তেহরানের নতুন অবস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করে এবং আঞ্চলিক দেশগুলোকে সেই ব্যবস্থায় যুক্ত করতে সক্ষম হয়, তাহলে ইরান কেবল কূটনৈতিক প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ না থেকে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত পাল্টা চাপ প্রয়োগের পথ বেছে নিতে পারে। রেজায়ি যে তিন ধাপের কৌশলের কথা তুলে ধরেছেন, তার প্রথম ধাপ হিসেবে তিনি সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা ও কূটনৈতিক যোগাযোগের কথা বলেছেন; দ্বিতীয় ধাপে তাদের যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উদ্যোগ থেকে সরে আসার জন্য চাপ দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন; আর শেষ পর্যায়ে সতর্ক করে বলেছেন, তারা অবস্থান পরিবর্তন না করলে ইরান তাদের স্বার্থকে লক্ষ্য করে পাল্টা পদক্ষেপ নিতে পারে। এই বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক সমীকরণে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে, কারণ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন ও কুয়েতসহ উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার প্রধান কেন্দ্র। এদিকে হরমুজ প্রণালির বাইরে বিকল্প তেল রপ্তানি পথগুলোর বিষয়েও ইরানের সতর্কবার্তা নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর মধ্যে লোহিত সাগরের দিকে যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ বাব আল-মান্দেব প্রণালিও পরোক্ষভাবে ঝুঁকির আওতায় আসতে পারে, কারণ হরমুজে বাধা সৃষ্টি হলে উপসাগরীয় কিছু দেশ বিকল্প রুট ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহের চেষ্টা করতে পারে। ফলে পারস্য উপসাগর, হরমুজ, আরব সাগর ও লোহিত সাগর—এই পুরো সামুদ্রিক করিডোরে নিরাপত্তা ঝুঁকি একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়তে পারে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে সামরিক স্থাপনা ও হাজার হাজার সেনা মোতায়েন রেখেছে, যার মধ্যে বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জর্ডানের মতো দেশ রয়েছে। এসব স্থাপনা ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা প্রতিক্রিয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে বলে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের আশঙ্কা। একই সঙ্গে ইরানের অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলার সক্ষমতা নিয়েও বড় প্রশ্ন রয়েছে। যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, বন্দর অবরোধ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংকোচনের কারণে তেহরানের অর্থনীতি ইতোমধ্যেই গভীর চাপের মধ্যে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি নতুন নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ইরানের তেল রপ্তানি, আর্থিক লেনদেন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আরও সীমিত করার চেষ্টা করে, তাহলে তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়তে পারে। তবে ইরানের নেতৃত্বের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, তারা অর্থনৈতিক চাপকে কেবল প্রতিরক্ষামূলকভাবে মোকাবিলা করতে চায় না; বরং এর মূল্য যুক্তরাষ্ট্র ও তার অংশীদারদের ওপরও চাপিয়ে দেওয়ার কৌশল গ্রহণ করতে পারে। প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানও বলেছেন, ইরান বর্তমানে পূর্ণমাত্রার অর্থনৈতিক, সামরিক ও নিরাপত্তা যুদ্ধে রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখেও দেশটি ভেঙে পড়েনি। তাঁর বক্তব্যে ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্বের অভ্যন্তরীণ ঐক্য ও প্রতিরোধের সক্ষমতাকে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটনের অবস্থানও ক্রমেই কঠোর হচ্ছে। মার্কিন প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে নতুন অর্থনৈতিক পদক্ষেপের পাশাপাশি দেশটির সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখা রাষ্ট্রগুলোর ওপরও চাপ বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের ‘আপনি আমাদের সঙ্গে অথবা আমাদের বিরুদ্ধে’ ধরনের অবস্থান আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় নতুন বিভাজনের আশঙ্কা তৈরি করেছে, বিশেষ করে চীন ইরানের তেল ক্রয়ের অন্যতম বড় বাজার হওয়ায়। এই পরিস্থিতিতে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত কেবল দুই দেশের সামরিক লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ থাকবে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। কারণ তেহরান যদি নিষেধাজ্ঞায় অংশ নেওয়া দেশগুলোর অর্থনৈতিক বা কৌশলগত স্বার্থকে লক্ষ্য করে পাল্টা ব্যবস্থা নেয়, তাহলে সংঘাতের ভৌগোলিক পরিধি দ্রুত বিস্তৃত হতে পারে। একই সঙ্গে হরমুজ বা বিকল্প সামুদ্রিক রুটে যেকোনো বড় ধরনের বিঘ্ন আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তেলের দাম বাড়ানো, সরবরাহ সংকট তৈরি এবং বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতির চাপ পুনরায় বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, ইরানের সাম্প্রতিক হুঁশিয়ারি সরাসরি যুদ্ধ শুরু করার ঘোষণা নয়; বরং সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ও সামরিক পদক্ষেপের আগে প্রতিপক্ষকে নিরুৎসাহিত করার একটি কৌশলগত বার্তা। তবে একই সঙ্গে এই বক্তব্যের কঠোরতা ইঙ্গিত করছে যে তেহরান এখন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে দেখছে এবং এর জবাবও সামরিক-নিরাপত্তা কাঠামোর মাধ্যমে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফলে আগামী দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা, উপসাগরীয় দেশগুলোর অবস্থান, চীনের সঙ্গে ইরানের বাণিজ্য এবং হরমুজ ও বাব আল-মান্দেবের সামুদ্রিক নিরাপত্তা—এই চারটি বিষয় মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কূটনৈতিক প্রচেষ্টা দ্রুত কার্যকর না হলে বর্তমান সংকট একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সংঘাতে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে, যার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের ওপরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
