কায়রো: ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত নতুন করে সামরিক ও অর্থনৈতিক উত্তেজনার দিকে মোড় নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী শনিবার জানিয়েছে, ইরানের তেলবাহী তিনটি ট্যাংকারে হামলা চালানো হয়েছে। মার্কিন দাবি অনুযায়ী, আঞ্চলিক জলসীমায় টহলরত একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ও একটি ডেস্ট্রয়ারকে ইরান একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তু করার পর পাল্টা এই অভিযান চালানো হয়। মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, হামলায় দুইটি ইরানি তেলবাহী জাহাজকে ‘স্থায়ীভাবে অচল’ করে দেওয়া হয়েছে এবং তেলবিহীন তৃতীয় একটি ট্যাংকার ধ্বংস করা হয়েছে। ওয়াশিংটন একই সঙ্গে সতর্ক করে বলেছে, প্রয়োজন হলে ইরানের সীমিত ও উন্মুক্ত তেলবহরের বিরুদ্ধে আরও ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, হামলা চালানো জাহাজগুলো এমন একটি গোপন তেল বাণিজ্য নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত ছিল, যার মাধ্যমে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস এবং অঞ্চলটির বিভিন্ন সশস্ত্র সহযোগী গোষ্ঠীর অর্থায়ন করা হচ্ছিল বলে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ। অন্যদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, খার্গ দ্বীপের কাছাকাছি একটি তেলবাহী ট্যাংকারে চারটি মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। খার্গ দ্বীপ ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি অবকাঠামোর একটি এবং যুদ্ধ শুরুর পর থেকে অঞ্চলটি একাধিকবার হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিবৃতিতে বলা হয়েছে, একটি ট্যাংকার খার্গ দ্বীপের কাছে এবং আরেকটি হরমুজ প্রণালীর পূর্বদিকে জাস্কের কাছে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে, আর তেলবিহীন তৃতীয় জাহাজটি ওমান উপসাগরে হামলার শিকার হয়েছে। এই হামলার মধ্য দিয়ে সংঘাতটি কেবল সামরিক স্থাপনা ও ক্ষেপণাস্ত্র বিনিময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অবকাঠামো ও তেল রপ্তানি ব্যবস্থার ওপরও সরাসরি চাপ সৃষ্টি করছে। ঘটনাটির গুরুত্ব আরও বেড়েছে কারণ এর মাত্র একদিন আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চলমান সংঘাতকে তুলনামূলকভাবে ছোট করে দেখানোর মতো মন্তব্য করেছিলেন। কিন্তু তেলবাহী জাহাজে নতুন হামলা এবং সামরিক বাহিনীর আরও পদক্ষেপের হুমকি সেই বক্তব্যের বিপরীতে সংঘাতের বাস্তব পরিস্থিতি যে এখনও অত্যন্ত গুরুতর, সেটিই সামনে আনছে। প্রায় ছয় মাস ধরে চলা এই অনিয়মিত যুদ্ধপর্বে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যেমন ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করার চেষ্টা করেছে, তেমনি ইরানও পাল্টা হামলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে ফেলার চেষ্টা করছে। এরই মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা ভেঙে পড়ায় যুদ্ধ বন্ধের সম্ভাবনাও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা এখন হরমুজ প্রণালী ও ইরানের তেল রপ্তানি ব্যবস্থা। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় ইরানের তেল অবকাঠামোতে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম, পরিবহন ব্যয় এবং সরবরাহ নিরাপত্তার ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে এশিয়ার তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য পরিস্থিতিটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী বাধা তৈরি হলে তার প্রভাব বিশ্ববাজারের পাশাপাশি বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিতেও পড়তে পারে। বাংলাদেশের জন্য এর সম্ভাব্য প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা দিতে পারে জ্বালানি আমদানি ব্যয়, পরিবহন খরচ, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে সমুদ্রপথে বাণিজ্য ও জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। এদিকে ইরানের তেল রপ্তানির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র খার্গ দ্বীপকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের তেল সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের আঘাত দেশটির রাজস্ব প্রবাহকে দুর্বল করতে পারে, আবার একই সঙ্গে বিশ্ববাজারে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা তৈরি করে তেলের মূল্য বাড়িয়ে দিতে পারে। ফলে ওয়াশিংটনের সামরিক চাপ একদিকে তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর কৌশল হলেও অন্যদিকে এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক সংঘাত যখন নতুন করে তীব্র হচ্ছে, তখন উভয় পক্ষের ভুল হিসাব বা বড় ধরনের পাল্টা আক্রমণ পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ আঞ্চলিক যুদ্ধে পরিণত করতে পারে। তেলবাহী জাহাজে হামলা, সামরিক জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ এবং গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ও তেল স্থাপনায় আঘাত—সবকিছু মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিও একই ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। কূটনৈতিক উদ্যোগ দ্রুত পুনরুজ্জীবিত না হলে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের পরবর্তী ধাপ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্রেই নয়, বরং বিশ্ব জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতেও বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।
