যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সাম্প্রতিক সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ দাবি করেছেন, আলোচনার সময় তেহরান কঠোর অবস্থান নেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র রাতারাতি ইরানের ওপর আরোপিত নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছিল। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমঝোতায় অবরোধ ৩০ দিনের মধ্যে প্রত্যাহারের কথা থাকলেও বাস্তবে তা ওই রাতেই প্রত্যাহার করা হয়।
গালিবাফের দাবি, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রথমে ঘোষণা করেছিলেন যে যুক্তরাষ্ট্র “আজ রাতেই” অবরোধ তুলে নিচ্ছে। তবে একই পোস্টে হরমুজ প্রণালী ইরান পুনরায় খুলে দেবে—এমন একটি শর্ত যুক্ত করা হলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে আপত্তি জানান। গালিবাফের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই শর্তটি দুই পক্ষের আলোচনায় ছিল না।
তিনি আরও দাবি করেন, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনকে জানানো হয়েছিল যে পোস্টের ওই অংশ প্রত্যাহার না করা হলে ইরান সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ৫৮ মিনিটের মধ্যেই ট্রাম্প তাঁর পোস্ট থেকে হরমুজ প্রণালী সম্পর্কিত অংশটি সরিয়ে দেন। ইরানি স্পিকার এই ঘটনাকে আলোচনায় তেহরানের কঠোর অবস্থানের একটি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
গালিবাফের বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো—তিনি আলোচনাকে কেবল কূটনৈতিক সমঝোতা হিসেবে নয়, বরং শক্তির ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার একটি ক্ষেত্র হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। এর আগে জুনে আল-জাজিরার প্রতিবেদনে গালিবাফকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছিল, কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে অবরোধ রাতারাতি প্রত্যাহার করা হয়েছিল এবং হরমুজ প্রণালীর যুদ্ধ-পূর্ব ব্যবস্থায় আর ফিরে যাওয়া হবে না।
তবে গালিবাফের সর্বশেষ বর্ণনার সব খুঁটিনাটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে ট্রাম্পের পোস্টের ঠিক কোন অংশ কখন মুছে ফেলা হয়েছিল এবং ৫৮ মিনিটের সময়সীমা—এসব দাবির বিষয়ে স্বাধীন মার্কিন সরকারি নথি বা নিরপেক্ষ সূত্রের প্রত্যক্ষ নিশ্চিতকরণ এখনো পাওয়া যায়নি। ফলে ঘটনাটিকে গালিবাফের বর্ণিত আলোচনার ভেতরের তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করাই অধিক সতর্ক সাংবাদিকতাসুলভ পদ্ধতি।
অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বিরোধ যে বাস্তব ও গভীর, তার প্রমাণ সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহেও রয়েছে। রয়টার্সের ১৪ আগস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তেজনা বৃদ্ধির মধ্যে প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় এবং যুক্তরাষ্ট্র অবরোধ ও অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর কথা জানিয়েছে।
আগের আলোচনাগুলোতেও অবরোধ প্রত্যাহার ও হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল ছিল অন্যতম প্রধান ইস্যু। রয়টার্স জানিয়েছে, সম্ভাব্য সমঝোতায় হরমুজে জাহাজ প্রবেশের ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি বড় ধরনের ছাড় হিসেবে বিবেচিত হলেও কার্গো ফি ও পরিদর্শন পদ্ধতি নিয়ে মতপার্থক্য ছিল।
এই প্রেক্ষাপটে গালিবাফের বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্যও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মূলত বোঝাতে চাইছেন, সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের কৌশলগত অবস্থান এবং আলোচনায় কঠোর শর্ত আরোপের সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রকে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে চাপ সৃষ্টি করেছিল। তবে ওয়াশিংটনের দৃষ্টিকোণ থেকে ঘটনাটিকে “ট্রাম্পের আত্মসমর্পণ” হিসেবে চিহ্নিত করার মতো স্বাধীন প্রমাণ এখনো সামনে আসেনি।
বরং সামগ্রিক পরিস্থিতি দেখায়, হরমুজ এখন শুধু একটি নৌপথ নয়—এটি যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপের কেন্দ্রবিন্দু। জাহাজ চলাচল, তেল রপ্তানি, অবরোধ প্রত্যাহার এবং প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ—প্রতিটি বিষয়ই বৃহত্তর সংঘাতের ফলাফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অতএব, গালিবাফের ৫৮ মিনিটের দাবি সত্য হলে এটি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার একটি তাৎপর্যপূর্ণ অভ্যন্তরীণ মুহূর্ত হতে পারে। কিন্তু স্বাধীনভাবে যাচাই না হওয়া পর্যন্ত এটিকে চূড়ান্ত সত্য নয়, বরং ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকারের গুরুত্বপূর্ণ দাবি হিসেবে বিবেচনা করাই আন্তর্জাতিক সংবাদ প্রতিবেদনের জন্য সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পন্থা।
