মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডেলান্ড ট্রাম্প কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছেন, এই জলপথ অবাধে চালু রাখার জন্য তিনি দীর্ঘদিন ধরে ইরানকে চাপ দিয়ে আসছেন, কিন্তু এখন বাধ্য হয়ে কঠোর অবস্থান নিতে হচ্ছে। রোববার সকালে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল–এ দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী মার্কিন নৌবাহিনী অবিলম্বে হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশকারী কিংবা সেখান থেকে বের হওয়া সব ধরনের জাহাজের বিরুদ্ধে অবরোধমূলক ব্যবস্থা শুরু করবে। তাঁর মতে, উদ্দেশ্য হলো এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করা যেখানে সবাই স্বাধীনভাবে চলাচল করতে পারে, কিন্তু ইরানের কারণে তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল যৌথ হামলার পর তেলবাহী ট্যাংকার চলাচলের ওপর চাপ বাড়ে এবং মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, যার ফলে তেলনির্ভর দেশগুলো বড় অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ে এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ না হলেও অভিযোগ রয়েছে যে ইরান প্রতিটি ট্যাংকার পারাপারের জন্য বিপুল অঙ্কের অর্থ ‘টোল’ হিসেবে আদায় করছে, যা প্রতি জাহাজে প্রায় ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত হতে পারে। একই সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতিতেও ইরান তার নিজস্ব তেল রপ্তানি অব্যাহত রেখেছে। কেপলার–এর তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চে ইরান দৈনিক প্রায় ১৮ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করেছে, যা আগের মাসগুলোর তুলনায় বেশি। ধারণা করা হচ্ছে, এই অর্থনৈতিক প্রবাহ সীমিত করতেই যুক্তরাষ্ট্রের এই কঠোর অবস্থান। হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি অবরোধ করা হলে ইরানের আয়ের বড় উৎস বন্ধ হয়ে যেতে পারে, তবে একই সঙ্গে বিশ্বব্যাপী তেলের বাজারে চরম অস্থিরতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে, এ কারণে এতদিন সরাসরি পূর্ণ অবরোধে যায়নি যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে বিপুল পরিমাণ তেল বাজারে আনার সুযোগ দেওয়া হয়, যা বৈশ্বিক সরবরাহে সাময়িক স্বস্তি দেয়। তবে এর আগে ২০১৮ সালে ইরান পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার পর দেশটির তেল রপ্তানির ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। সাম্প্রতিক নীতি পরিবর্তনে বাজারে অতিরিক্ত তেল প্রবেশ করায় একদিকে দাম নিয়ন্ত্রণে এসেছে, অন্যদিকে ইরানের আয় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে সমালোচনাও রয়েছে। ট্রাম্প আরও বলেন, ইরান যাকে ইচ্ছা তেল বিক্রি করবে আর অন্যদের চলাচল বন্ধ করবে—এটি যুক্তরাষ্ট্র মেনে নেবে না; তাই নীতি হবে হয় সবাই চলবে, না হয় কেউই চলবে না। একই সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দপ্তর জানায় যে পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের আশপাশে ইরানি বন্দরের দিকে যাওয়া সব জাহাজ পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা হচ্ছে এবং নির্দিষ্ট সময় থেকে বিধিনিষেধ কার্যকর হতে পারে। অন্যদিকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা (আই আর জি সি)কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে জানায়, কোনো বিদেশি সামরিক জাহাজ হরমুজ প্রণালির কাছে গেলে তা যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করা হবে এবং এর জবাবে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তারা দাবি করে, হরমুজ প্রণালি বর্তমানে তাদের নৌবাহিনীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল চালু থাকলেও নির্দিষ্ট নিয়মনীতি মানতে হবে। একই সঙ্গে যুদ্ধবিরতি পরিস্থিতি নিয়েও বলা হয় যে ৭ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও বাস্তবে ওই অঞ্চলে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়, কারণ অনেক জাহাজ নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে বিকল্প পথ ব্যবহার করে বা চলাচল সীমিত করে। মেরিন ট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় এই প্রণালিতে জাহাজ চলাচল অনেক কমে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্ভাব্য মার্কিন অবরোধ কার্যকর হলেও স্বল্পমেয়াদে এর প্রভাব সীমিত থাকবে, কারণ ইতিমধ্যেই এই রুটে জাহাজ চলাচল কমে গেছে এবং যেসব কোম্পানি ইরানের সঙ্গে লেনদেন করে তারা আগেই নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে। তাই অধিকাংশ শিপিং কোম্পানি বর্তমানে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে স্থায়ী সমঝোতা বা শান্তি চুক্তির অপেক্ষায় থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
