যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলায় ইরান যুদ্ধ শুরুর ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে। এই ছয় মাসে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কেবল আকাশপথে হামলা কিংবা সামরিক স্থাপনা ধ্বংসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং ধীরে ধীরে তা পরিণত হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী অবরোধ, অর্থনৈতিক চাপ, সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণ, পাল্টা হামলা, যুদ্ধবিরতি, কূটনৈতিক দর-কষাকষি এবং পুনরায় সংঘাতের এক জটিল অধ্যায়ে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বার্তাগুলো বিশ্লেষণ করলে গত ছয় মাসের যুদ্ধের রাজনৈতিক ও সামরিক গতিপথের একটি ধারাবাহিক চিত্র পাওয়া যায়। যুদ্ধ শুরুর আগে আলোচনার আহ্বান থেকে শুরু করে সামরিক হামলার ঘোষণা, ইরানের আত্মসমর্পণের দাবি, হরমুজ প্রণালী অবরোধ, যুদ্ধবিরতি, নতুন করে হামলা এবং অর্থনৈতিক চাপ—প্রতিটি পর্যায়েই ট্রাম্পের বক্তব্যে যুদ্ধের পরিবর্তনশীল চরিত্র ফুটে উঠেছে।
আল-জাজিরার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৫ আগস্ট পর্যন্ত ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্তত ৪ হাজার ১৮৯টি বার্তা প্রকাশ করেন। এর মধ্যে অন্তত ৩১৯টি বার্তায় ইরানের উল্লেখ ছিল। অর্থাৎ গড়ে প্রায় প্রতি ১৪ ঘণ্টায় একটি বার্তায় ইরানের প্রসঙ্গ এসেছে। ছয় মাসের এসব বার্তা মিলিয়ে প্রায় ৩২ হাজার ৪৭৮ শব্দের একটি রাজনৈতিক ও সামরিক বয়ান তৈরি হয়েছে।
এই বয়ানে যুদ্ধের ঘোষণা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে যুদ্ধ জয়ের দাবি, আলোচনার উদ্যোগ, যুদ্ধবিরতির ঘোষণা, হরমুজ প্রণালী অবরোধ এবং পুনরায় সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকিও।
যুদ্ধের আগে: হুমকির পাশাপাশি আলোচনার আহ্বান
যুদ্ধ শুরুর আগে ইরান প্রসঙ্গে ট্রাম্পের বক্তব্যে একই সঙ্গে কঠোর হুমকি ও কূটনৈতিক সমঝোতার আহ্বান দেখা যায়।
১ জানুয়ারি থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি ইরান নিয়ে ১৭টি বার্তা প্রকাশ করেন। এসব বার্তায় একদিকে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ বাড়ানোর কথা বলা হয়, অন্যদিকে তেহরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরে আসার আহ্বান জানানো হয়।
ট্রাম্প বারবার একটি চুক্তির প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরলেও একই সঙ্গে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনাও সামনে রাখেন। ২৮ জানুয়ারি তিনি ইরানের দিকে একটি বৃহৎ নৌবহর অগ্রসর হওয়ার কথা জানান। এর পর থেকেই সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা ক্রমশ বাড়তে থাকে।
২৮ ফেব্রুয়ারি: যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সূচনা
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্তৃপক্ষ ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরুর ঘোষণা দেয়। এর কিছুক্ষণ পর ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার কথা জানান।
এর পরপরই সংঘাত দ্রুত বিস্তৃত হয়। ট্রাম্প ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে কঠোর ভাষায় আক্রমণ করেন এবং তার মৃত্যুর দাবিও প্রকাশ করেন।
পরবর্তী দুই সপ্তাহে তিনি আরও বহুবার যুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেন এবং ইরানের কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের দাবি জানান।
এই পর্যায়ে সংঘাত কেবল নির্দিষ্ট কয়েকটি সামরিক স্থাপনায় হামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ইরানের সামরিক বাহিনী, নেতৃত্ব, নৌ সক্ষমতা এবং কৌশলগত অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে অভিযান বিস্তৃত হতে থাকে।
খার্গ দ্বীপ: ইরানের তেল অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু
যুদ্ধের শুরু থেকেই ইরানের তেল অবকাঠামো এবং পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ সংঘাতের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
১৩ মার্চ ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক লক্ষ্য হিসেবে খার্গ দ্বীপের সামরিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস করেছে। তবে দ্বীপটির তেল অবকাঠামো ধ্বংস না করার সিদ্ধান্তের কথাও তিনি জানান।
এর পরদিন তিনি দাবি করেন, ইরানের সামরিক সক্ষমতার সম্পূর্ণ অংশ ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।
তবে পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে দেখা যায়, ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়নি। ফলে যুদ্ধের প্রথম দিকের বিজয়-দাবিগুলোর বাস্তবতা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
হরমুজ প্রণালী: যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক মঞ্চ
যুদ্ধ যত এগিয়েছে, হরমুজ প্রণালী ততই সংঘাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হিসেবে হরমুজের গুরুত্ব কেবল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই জলপথে অস্থিরতা তৈরি হলে মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস সরবরাহের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, জাহাজ চলাচল এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
মার্চের প্রথম দিকে হরমুজ নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য তুলনামূলকভাবে সীমিত থাকলেও মাসের মাঝামাঝি থেকে বিষয়টি তার যুদ্ধনীতির অন্যতম প্রধান উপাদানে পরিণত হয়।
এপ্রিল নাগাদ হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ যুদ্ধের অন্যতম প্রধান অস্ত্রে পরিণত হয়।
৭ এপ্রিল: চূড়ান্ত হামলার হুমকি এবং আকস্মিক যুদ্ধবিরতি
৭ এপ্রিল সংঘাত নতুন এক বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছায়। ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে একটি চূড়ান্ত হামলার হুমকি দেন এবং এমন ভাষা ব্যবহার করেন, যাতে ব্যাপক ধ্বংসের আশঙ্কা তৈরি হয়।
কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং দেশটির সামরিক নেতৃত্বের অনুরোধের কথা উল্লেখ করে ট্রাম্প হামলা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত জানান। একই সঙ্গে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির কথাও সামনে আসে।
এই ঘটনার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, সরাসরি সামরিক শক্তির পাশাপাশি আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যস্থতাও যুদ্ধের গতিপথ পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে।
১২ এপ্রিল: হরমুজে নৌ অবরোধ
১২ এপ্রিল ট্রাম্প হরমুজ প্রণালীতে নৌ অবরোধের ঘোষণা দেন। যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী প্রণালীতে প্রবেশ কিংবা সেখান থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করা জাহাজগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে বলে তিনি জানান।
পরবর্তী সময়ে এই অবরোধকে তিনি ইস্পাতের দেয়াল হিসেবে বর্ণনা করেন।
যুদ্ধের অন্যান্য নীতিতে পরিবর্তন এলেও হরমুজ অবরোধ বারবার ফিরে এসেছে। এর ফলে ইরানের ওপর সামরিক চাপের পাশাপাশি অর্থনৈতিক চাপও বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
ইরানের তেল রপ্তানি, সমুদ্রপথে বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর এর প্রভাব নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও উদ্বেগ বাড়তে থাকে।
এপ্রিল ও মে: যুদ্ধ যখন দীর্ঘ ক্ষয়যুদ্ধে পরিণত হয়
এপ্রিলের শেষদিকে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান রাষ্ট্রীয় পতনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। একই সময়ে তিনি অবরোধের কারণে ইরানের অর্থনীতি ও সামরিক সক্ষমতার ওপর তৈরি হওয়া চাপের কথা তুলে ধরতে থাকেন।
কিন্তু যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার পরিবর্তে ধীরে ধীরে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষয়যুদ্ধে পরিণত হয়।
আকাশপথে হামলার পাশাপাশি অর্থনৈতিক অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা, সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণ এবং কূটনৈতিক চাপ সংঘাতের প্রধান হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
৩ মে ট্রাম্প নিরপেক্ষ দেশগুলোর জাহাজকে হরমুজ প্রণালী থেকে বের করে আনার জন্য মার্কিন নৌবাহিনীর একটি বিশেষ কার্যক্রমের ঘোষণা দেন। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশের অনুরোধে সেই কার্যক্রম স্থগিত করা হয়।
কূটনীতির নতুন অধ্যায়
মে মাসে যুদ্ধের চরিত্র আরও পরিবর্তিত হয়।
সামরিক সংঘাত চললেও প্রকাশ্য কূটনৈতিক দর-কষাকষি শুরু হয়। ১৮ মে ট্রাম্প জানান, উপসাগরীয় দেশগুলোর নেতাদের অনুরোধে একটি সম্ভাব্য হামলা বাতিল করা হয়েছে।
এর কয়েক দিন পর তিনি পাকিস্তান, তুরস্ক, মিসর, জর্ডান ও বাহরাইনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার কথা জানান এবং শান্তির জন্য একটি সমঝোতা কাঠামো তৈরির উদ্যোগের কথা বলেন।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ওই আলোচনায় ইসরায়েল সরাসরি উপস্থিত ছিল না। ট্রাম্প জানান, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে তিনি আলাদাভাবে কথা বলেছেন।
এ পর্যায়ে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হয়েছে, আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীদের গুরুত্ব ততই বেড়েছে।
১৪ জুন: চুক্তির ঘোষণা, কিন্তু শান্তি স্থায়ী হলো না
১৪ জুন ট্রাম্প ঘোষণা করেন, ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে আবার যাত্রা শুরু করার আহ্বান জানান।
কিন্তু সেই সমঝোতার স্থায়িত্ব খুব বেশি দিন বজায় থাকেনি।
২৬ জুন ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান হরমুজ প্রণালীতে চলাচলকারী জাহাজগুলোর দিকে কয়েকটি চালকবিহীন আকাশযান পাঠিয়েছে এবং একটি বাণিজ্যিক জাহাজে আঘাত করেছে।
দুই দিন পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র মজুত ও উপকূলীয় নজরদারি স্থাপনায় হামলা চালায় বলে ট্রাম্প জানান। তার অভিযোগ ছিল, ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করেছে।
এর ফলে সদ্য ঘোষিত যুদ্ধবিরতি আবারও গভীর সংকটে পড়ে।
জুলাই: যুদ্ধবিরতির অবসান ও অবরোধ পুনর্বহাল
৮ জুলাই ইরানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের চাবাহার এলাকায় আগুনের একটি ছবি ট্রাম্প প্রকাশ করেন এবং সেটিকে ইরানের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করেন।
১০ জুলাই তিনি ঘোষণা করেন, যুদ্ধবিরতি আর কার্যকর নেই।
এর মাত্র কয়েক দিন পর হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে ইরানের ওপর অবরোধ পুনর্বহালের ঘোষণা আসে।
২২ জুলাই ট্রাম্প আরও কঠোর একটি নীতি ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, হরমুজে ইরান কোনো জাহাজে হামলা চালালে যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে একটি সেতু অথবা বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস করবে।
এর ফলে হরমুজ প্রণালী কেবল একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টা সামরিক ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
আগস্ট: বিজয়ের দাবি, কিন্তু সংঘাত তখনও শেষ হয়নি
১০ আগস্ট ট্রাম্প এমন একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন, যার শিরোনাম ছিল—ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান যুদ্ধ জিতেছেন।
কিন্তু একই সময়ে যুদ্ধের বাস্তব চিত্র ছিল অনেক বেশি জটিল।
ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়েনি। কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক পরিবর্তনও ঘটেনি। হরমুজ প্রণালী নিয়ে সংকটও শেষ হয়নি। বরং সামরিক সংঘাত ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক লড়াইয়ে রূপ নেয়।
৬০ দিনের সমঝোতা কাঠামোর মেয়াদ শেষ হয়ে যায় এবং তার জায়গায় নতুন কোনো স্থায়ী সমঝোতা কার্যকর হয়নি।
ট্রাম্প হরমুজ প্রণালীকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণার কথাও বলেন।
১৯ আগস্ট তিনি ইরানের বিরুদ্ধে ইতিহাসের অন্যতম কঠোর অর্থনৈতিক অভিযান চালানোর ঘোষণা দেন এবং ইরানকে আর্থিকভাবে সহায়তা করা দেশগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেন।
ছয় মাস পরও যুদ্ধের শেষ কোথায়?
যুদ্ধ শুরুর ছয় মাস পর মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি বলছে, যুদ্ধের সমাপ্তি ঘোষণা করা যতটা সহজ, স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান ইরানের সামরিক ও অবকাঠামোগত সক্ষমতার ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করলেও ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়েনি।
একইভাবে হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে সংকটও পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়নি।
বরং সাম্প্রতিক সময়ে কাতার, ওমান ও পাকিস্তানের কর্মকর্তাদের কূটনৈতিক তৎপরতায় আবারও আলোচনার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো সামরিক উত্তেজনা কমিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন আলোচনার পথ তৈরি করার চেষ্টা করছে।
ট্রাম্পের ৩১৯টি বার্তা: ছয় মাসের যুদ্ধের রাজনৈতিক দলিল
গত ছয় মাসের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলোর একটি হলো, ট্রাম্পের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বার্তাগুলো কীভাবে যুদ্ধের একটি রাজনৈতিক দলিলে পরিণত হয়েছে।
আল-জাজিরার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ট্রাম্পের এসব বার্তায় ইরানের উল্লেখ শত শতবার এসেছে। নিজের নামও তিনি বিপুলসংখ্যক বার্তায় ব্যবহার করেছেন। হরমুজ প্রণালী, পারমাণবিক অস্ত্র এবং ইসরায়েল—এই তিনটি বিষয়কে একত্র করেও নিজের নামের উল্লেখের সংখ্যা ছাড়িয়ে যায়নি।
তার বার্তাগুলোর উল্লেখযোগ্য অংশের শেষে প্রায় একই ধরনের বাক্য ব্যবহার করা হয়েছে—যার মাধ্যমে তিনি পাঠকদের নিজের বক্তব্যের প্রতি মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
এই পরিসংখ্যানগুলো দেখায়, যুদ্ধের সামরিক ঘটনাপ্রবাহের পাশাপাশি জনমত গঠন ও রাজনৈতিক বার্তা প্রচারও সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছিল।
সামনে কী?
ছয় মাসের যুদ্ধের পর এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—পরবর্তী অধ্যায় কি আবার পূর্ণমাত্রার সামরিক সংঘাত, নাকি নতুন কোনো কূটনৈতিক সমঝোতা?
হরমুজ প্রণালী এখনও আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত থাকলে তেলবাজার, জাহাজ চলাচল এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতিতে এর প্রভাব আরও বাড়তে পারে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা আবারও বাড়লে পুরো মধ্যপ্রাচ্য আরও গভীর অনিশ্চয়তার দিকে এগিয়ে যেতে পারে।
তবে কাতার, ওমান ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলোর মধ্যস্থতামূলক তৎপরতা একটি বিকল্প পথের সম্ভাবনাও তৈরি করছে।
কিন্তু অতীতে ঘোষিত যুদ্ধবিরতি ও সমঝোতাগুলো যেভাবে ভেঙে পড়েছে, তাতে নতুন কোনো চুক্তি কতটা স্থায়ী হবে—তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন।
ছয় মাসের এই যুদ্ধ তাই কেবল একটি সামরিক সংঘাতের ইতিহাস নয়। এটি শক্তি প্রদর্শন, অর্থনৈতিক অবরোধ, সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক প্রচার, আঞ্চলিক মধ্যস্থতা এবং কূটনৈতিক দর-কষাকষিরও একটি দীর্ঘ অধ্যায়।
ট্রাম্পের শত শত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বার্তা সেই পরিবর্তনশীল যুদ্ধনীতির একটি অনন্য রাজনৈতিক রেকর্ড তৈরি করেছে—যেখানে যুদ্ধ কখনও চূড়ান্ত বিজয় হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে, কখনও চুক্তির ঘোষণা এসেছে, কখনও যুদ্ধবিরতি হয়েছে, আবার কখনও নতুন করে অবরোধ ও সামরিক হামলার হুমকি ফিরে এসেছে।
ছয় মাস পরও তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি রয়ে গেছে—ইরান যুদ্ধ কি সত্যিই শেষ হওয়ার পথে, নাকি মধ্যপ্রাচ্য আরও দীর্ঘ ও অনিশ্চিত সংঘাতের নতুন অধ্যায়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে?
