গাজা উপত্যকায় দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক কাঠামো বিলুপ্ত করার ঘোষণা দিয়ে হামাস একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পদক্ষেপ নিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত গাজা যুদ্ধবিরতি ও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে সবচেয়ে বড় বাধা—হামাসের অস্ত্র ও সামরিক সক্ষমতা—সমাধান করতে পারছে না। ২০০৭ সালে ফাতাহর সঙ্গে সংঘর্ষের পর গাজা উপত্যকার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের পর থেকে হামাসের ১৫ সদস্যের প্রশাসনিক কমিটি অঞ্চলটির বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং জনসেবা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল। প্রায় দুই বছরের বিধ্বংসী যুদ্ধে গাজার অধিকাংশ বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর হামাস ঘোষণা দিয়েছে যে তারা প্রশাসনিক দায়িত্ব ‘ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা (এনসিএজি)’ নামে প্রযুক্তিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত একটি স্বাধীন কমিটির কাছে হস্তান্তর করবে, যা অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে গাজার বেসামরিক প্রশাসন পরিচালনা করবে। হামাসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রস্তুতি হিসেবে এনসিএজির সঙ্গে সমন্বয় শুরু করেছেন। যদিও কমিটির প্রধান আলী শা’আতসহ সদস্যরা এখনও মিশরে অবস্থান করছেন এবং গাজায় প্রবেশ করতে পারেননি, তবুও তারা দায়িত্ব গ্রহণে প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘোষণা এমন সময় এসেছে যখন যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন এবং শান্তি প্রক্রিয়া কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। হামাসের দাবি, আন্তর্জাতিকভাবে সমর্থিত যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনার আওতায় গাজায় পর্যাপ্ত মানবিক সহায়তা প্রবেশের যে প্রতিশ্রুতি ছিল, ইসরায়েল তা পূরণ করছে না; যদিও ইসরায়েল এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশাসনিক ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার মাধ্যমে হামাস আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের কাছে নিজেদের আপসের মনোভাব তুলে ধরতে চাইছে এবং একই সঙ্গে ইসরায়েলের সেই যুক্তিকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে যে, গাজায় হামাসের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণই সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ। তবে অধিকাংশ বিশ্লেষকই মনে করেন, হামাসের প্রকৃত শক্তি শুধু প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সংগঠনটি এখনও তাদের সশস্ত্র বাহিনী, সামরিক অবকাঠামো এবং অস্ত্রভাণ্ডার ধরে রেখেছে, যা ইসরায়েলের কাছে যুদ্ধের মূল ইস্যু হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ইসরায়েলি সরকার এবং দেশটির বিভিন্ন গণমাধ্যম হামাসের এই ঘোষণাকে একটি রাজনৈতিক কৌশল বা প্রতারণামূলক পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। ইসরায়েলের অবস্থান হলো, হামাস সম্পূর্ণভাবে নিরস্ত্র না হওয়া এবং গাজা পুরোপুরি সামরিকীকরণমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত স্থায়ী যুদ্ধবিরতি বা যুদ্ধের অবসান সম্ভব নয়। অন্যদিকে হামাস বলছে, একটি গ্রহণযোগ্য ফিলিস্তিনি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের কার্যকর প্রক্রিয়া শুরু না হওয়া পর্যন্ত তারা তাদের অস্ত্র সমর্পণ করবে না, কারণ এটিকেই তারা নিজেদের প্রধান রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাবের উৎস হিসেবে বিবেচনা করে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও ইসরায়েল গাজার উল্লেখযোগ্য অংশে তাদের সামরিক উপস্থিতি আরও সম্প্রসারণ করেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিকভাবে সমর্থিত ধাপভিত্তিক শান্তি পরিকল্পনায় পূর্ণাঙ্গ ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারকে দীর্ঘমেয়াদি একটি লক্ষ্য হিসেবে রাখা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক সংকট, অবরোধ, সীমিত সরবরাহ ব্যবস্থা এবং সরকারি কর্মচারীদের বেতন ও জনসেবার ব্যয় বহনে অক্ষমতা হামাসকে প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাবিত করেছে। তবুও তারা মনে করেন, এই পদক্ষেপ মূলত একটি রাজনৈতিক বার্তা, ক্ষমতার প্রকৃত পরিবর্তন নয়। কারণ গাজার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—হামাসের নিরস্ত্রীকরণ, ইসরায়েলি বাহিনীর প্রত্যাহার, মানবিক পুনর্গঠন, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং গ্রহণযোগ্য ফিলিস্তিনি প্রশাসন প্রতিষ্ঠার মতো জটিল রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত প্রশ্নগুলোর সমাধান। তাই হামাসের প্রশাসনিক কমিটি বিলুপ্তির ঘোষণা শান্তি প্রক্রিয়ায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করলেও, মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ এখনও বহু কঠিন কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জে পরিপূর্ণ।
