নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উচ্চপর্যায়ের বিতর্কে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য ঘিরে আবারও সামনে এসেছে ওয়াশিংটন ও তেহরানের সংঘাত, তবে এবারের দৃশ্যপটের বিশেষ তাৎপর্য হলো, যে অধিবেশনের মূল থিম “আস্থা পুনর্গঠন, পরিবর্তন ব্যবস্থাপনা: সবার জন্য কার্যকর একটি জাতিসংঘ”, সেই মঞ্চেই ট্রাম্প ইরানকে নিয়ে সামরিক ধ্বংসের সম্ভাবনা প্রকাশ্যে তুলে ধরেছেন। ২২ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে দেওয়া প্রায় ৪০ মিনিটের ভাষণে ট্রাম্প বলেন, ইরান নিয়ে তাঁর সামনে একটি বড় সিদ্ধান্ত রয়েছে: তেহরানের সঙ্গে এমন একটি চুক্তি হবে কি না, যার মাধ্যমে ইরান আবার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে আগের চেয়েও শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে, নাকি যুক্তরাষ্ট্র ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে “annihilate” বা সম্পূর্ণ ধ্বংস করার পথ বেছে নেবে। তিনি আরও বলেন, প্রয়োজনে ইরানকে “নরকে ঠেলে” দেওয়ার মতো কঠোর পদক্ষেপও তাঁর বিবেচনায় রয়েছে। ট্রাম্পের বক্তব্যের এই অংশ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে দ্রুত প্রধান শিরোনামে পরিণত হয়। রয়টার্স জানিয়েছে, ট্রাম্প তাঁর বক্তব্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের যৌক্তিকতা তুলে ধরেন এবং বলেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে তিনি অন্য দেশগুলোকে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বজায় রাখার আহ্বান জানান। ট্রাম্পের বক্তব্যে একই সঙ্গে যুদ্ধ ও আলোচনার দুটি সম্ভাবনা পাশাপাশি উঠে আসে। একদিকে তিনি ইরানকে ধ্বংস করার হুমকি দেন, অন্যদিকে বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি হতে পারে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তেহরান সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল পর্যবেক্ষণ করছে এবং এরপর আলোচনায় যেতে পারে। ট্রাম্প বলেন, তিনি নির্বাচনের কারণে ইরান নীতিতে প্রভাবিত হচ্ছেন না, কিন্তু একই সঙ্গে তাঁর ধারণা হলো নির্বাচনের পর একটি চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই দ্বৈত বার্তা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের সামনে ওয়াশিংটনের বর্তমান অবস্থান নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও তুলেছে: যুক্তরাষ্ট্র কি সামরিক চাপের মাধ্যমে ইরানকে আলোচনায় আনতে চাইছে, নাকি সংঘাত আরও বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে? ট্রাম্পের ভাষণের পরের ঘটনাপ্রবাহ অবশ্য দেখিয়েছে যে কূটনৈতিক যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ট্রাম্প পরে জানান, তাঁর দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে ইরানি প্রতিনিধিদের প্রায় তিন ঘণ্টার একটি বৈঠক হয়েছে। ট্রাম্প ওই বৈঠককে ভালো বলে বর্ণনা করেন। অর্থাৎ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মঞ্চে প্রকাশ্য হুমকির পাশাপাশি পর্দার আড়ালে আলোচনাও চলছিল। এই বৈপরীত্যই এবারের মার্কিন-ইরান কূটনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠেছে। ট্রাম্পের বক্তব্যের সময় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ কক্ষেও ইরানকে ঘিরে দৃশ্যমান প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানি প্রতিনিধিদলের অধিকাংশ সদস্য ট্রাম্পের বক্তব্য চলাকালে হল থেকে বেরিয়ে যান। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি নিউইয়র্কে উপস্থিত থাকলেও ট্রাম্পের বক্তব্যের সময় তাঁরা সাধারণ পরিষদ কক্ষে ছিলেন না। পাঞ্চসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানি প্রতিনিধিদলের সদস্যরা ট্রাম্পের বক্তব্যের ইরান-সংক্রান্ত অংশের সময় হল ত্যাগ করেন। এই দৃশ্য কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাৎপর্যপূর্ণ হলেও এটিকে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার সম্পূর্ণ সমাপ্তি হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। কারণ একই দিনের পরবর্তী সময়ে মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদের মধ্যে বৈঠক হয়েছে। ফলে একদিকে প্রকাশ্য মঞ্চে কঠোর বক্তব্য, অন্যদিকে একই সময়ে বা তার পরেই গোপনীয় কূটনৈতিক যোগাযোগ, এই দুই প্রবণতা পাশাপাশি চলছে। জাতিসংঘের এবারের অধিবেশনের প্রেক্ষাপটও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ৮১তম সাধারণ পরিষদের আনুষ্ঠানিক থিম হলো “Restoring Trust, Managing Transformation: A United Nations That Delivers for All”, অর্থাৎ আস্থা পুনর্গঠন, পরিবর্তন ব্যবস্থাপনা এবং সবার জন্য কার্যকর জাতিসংঘ গড়ে তোলা। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ২ জুন ২০২৬ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং ৮ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। জাতিসংঘের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্বের মধ্যে অধিবেশনের পূর্ণাঙ্গ সভা পরিচালনা, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আলোচনা ও সমঝোতার পরিবেশ তৈরি এবং সাধারণ পরিষদের কাজকে এগিয়ে নেওয়া অন্তর্ভুক্ত। ড. খলিলুর রহমান ২২ সেপ্টেম্বর সাধারণ বিতর্কের উদ্বোধনী বক্তব্যে বলেন, জাতিসংঘের ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষ শুধু এই প্রশ্ন করছে না যে প্রতিষ্ঠানটি এখনো আছে কি না; তারা জানতে চাইছে, এটি কার্যকরভাবে কাজ করছে কি না। তাঁর বক্তব্যে আস্থা পুনর্গঠন, বহুপাক্ষিক সহযোগিতা এবং বাস্তব ফল দেওয়ার সক্ষমতার ওপর জোর দেওয়া হয়। এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের ইরানবিষয়ক বক্তব্যকে দেখলে জাতিসংঘের এবারের মূল থিমের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাস্তবতার একটি তীব্র বৈপরীত্য সামনে আসে। একদিকে আস্থা ও কূটনৈতিক সমাধানের কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট একই মঞ্চে আরেকটি রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার সম্ভাবনা প্রকাশ করছেন। ট্রাম্প তাঁর বক্তব্যের বড় একটি অংশ ব্যয় করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইরানবিরোধী সামরিক অভিযানের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরতে। তিনি বলেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বড় হুমকি তৈরি করেছে। তাঁর দাবি, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দিকে এগোচ্ছিল এবং ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে সেই সম্ভাব্য কর্মসূচির প্রতিরক্ষামূলক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছিল। ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন অপেক্ষা করার পর তিনি সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর প্রশাসনের বক্তব্য হলো, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য। তবে ইরানের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ এবং তার যৌক্তিকতা নিয়ে তীব্র আপত্তি রয়েছে এবং তেহরান ওয়াশিংটনের চাপকে কূটনীতির পথে বড় বাধা হিসেবে দেখাচ্ছে। ইরান ইস্যুতে ট্রাম্পের বক্তব্যের আরেকটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুদ নিয়ে বিতর্ক। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডারে চাপ তৈরি হয়েছে কি না, তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মধ্যে আলোচনা চলছে। ট্রাম্প অবশ্য এই ধরনের আশঙ্কাকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ব্যবহার করার চিন্তার চেয়েও বেশি গোলাবারুদ রয়েছে এবং দেশটি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় দ্রুত গতিতে নতুন গোলাবারুদ তৈরি করছে। ট্রাম্পের বক্তব্য ছিল, যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক মজুদ কমিয়ে ফেলেনি; বরং উৎপাদন বাড়িয়ে মজুদ পুনর্গঠন করছে। তবে এই দাবির বিপরীতে সাম্প্রতিক মার্কিন সরকারি মূল্যায়ন ও সংবাদ প্রতিবেদনে যুদ্ধের কারণে কিছু অস্ত্রের মজুদের ওপর চাপের কথা উঠে এসেছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, বিশেষজ্ঞদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র মজুদ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। অন্যদিকে কিউজেড-এর প্রতিবেদনে পেন্টাগনের ইন্সপেক্টর জেনারেলের মূল্যায়নের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, সংঘাতের কারণে কিছু গোলাবারুদের কৌশলগত মজুদে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ফলে ট্রাম্পের “মজুদ কমেনি” বক্তব্য এবং যুদ্ধের কারণে কিছু অস্ত্রের মজুদের ওপর চাপ তৈরি হওয়ার সরকারি ও বিশ্লেষণভিত্তিক তথ্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের মানবিক দিকও এবারের জাতিসংঘ অধিবেশনে বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। ট্রাম্পের বক্তব্যের কয়েক দিন আগে জাতিসংঘ-সমর্থিত একটি অনুসন্ধানী মিশন জানিয়েছে, ইরানে ফেব্রুয়ারির দুটি মার্কিন বিমান হামলার ঘটনায় যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে বলে বিশ্বাস করার মতো যুক্তিসংগত ভিত্তি রয়েছে। এর মধ্যে মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলার ঘটনায় ১৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হওয়ার কথা জাতিসংঘের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, যাদের মধ্যে প্রায় ১২০ জন শিশু ছিল বলে রয়টার্স জানিয়েছে। লামার্দে একটি ক্রীড়া স্থাপনা ও আবাসিক এলাকার কাছেও আরেকটি হামলার কথা তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে। জাতিসংঘের অনুসন্ধানী মিশনের অভিযোগ অনুযায়ী, এসব হামলায় বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সতর্কতা নেওয়া হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য ওই অনুসন্ধানের মূল্যায়ন প্রত্যাখ্যান করেছে এবং জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলেছে। মিনাবের স্কুল হামলা নিয়ে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচও এর আগে বলেছিল, মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রাথমিক তদন্তে ওই হামলার সঙ্গে পুরোনো বা ভুল টার্গেটিং তথ্যের সম্পর্ক পাওয়া গিয়েছিল। সংস্থাটি বলেছিল, সামরিক অভিযানে বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি কমানোর জন্য সম্ভাব্য সব সতর্কতা নেওয়া আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাধ্যবাধকতা। এই ঘটনাগুলো ইরানের জন্য আগামী জাতিসংঘ ভাষণে একটি বড় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিষয় হয়ে উঠতে পারে। তবে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের বক্তব্যে ঠিক কোন শব্দ ব্যবহার করা হবে বা তিনি নির্দিষ্ট কোনো ঘটনাকে কীভাবে উপস্থাপন করবেন, তা বক্তব্যের আগে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তাই তাঁর পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি “শিশুহত্যাকারী” বলা হবে বা কোনো নির্দিষ্ট ঘটনাকে নিশ্চিতভাবে “যুদ্ধাপরাধ” হিসেবে ঘোষণা করা হবে, এমন দাবি আগাম করা সংবাদগতভাবে সতর্কতার দাবি রাখে। তবে মিনাবের স্কুল হামলা নিয়ে জাতিসংঘ-সমর্থিত অনুসন্ধান এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর বক্তব্য ইরানের হাতে আন্তর্জাতিক ফোরামে উত্থাপনের মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। ইরানের সম্ভাব্য অবস্থান আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে কারণ তেহরান একই সঙ্গে সামরিক চাপ এবং কূটনৈতিক আলোচনার দুই বাস্তবতার মধ্যে অবস্থান করছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট প্রকাশ্যে ইরানকে ধ্বংসের হুমকি দিচ্ছেন, অন্যদিকে তাঁর প্রশাসনের প্রতিনিধিরাই ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠকে বসছেন। এর অর্থ এই নয় যে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা নিশ্চিত হয়ে গেছে। বরং বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, সংঘাতের মধ্যেও যোগাযোগের একটি কূটনৈতিক চ্যানেল খোলা রয়েছে। ট্রাম্প নিজেও বলেছেন, তিনি একটি চুক্তির সম্ভাবনা দেখছেন এবং ইরানের সঙ্গে সমঝোতা হলে দেশটি অর্থনৈতিকভাবে পুনর্গঠনের সুযোগ পেতে পারে। একই সঙ্গে তিনি ইরানের ওপর চাপ বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। এই অবস্থায় জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশন ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের জন্য শুধু আরেকটি আন্তর্জাতিক মঞ্চ নয়; এটি প্রকাশ্য বক্তব্য ও পর্দার আড়ালের কূটনীতির একই সঙ্গে চলার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। সাধারণ পরিষদের হলের ভেতরে ট্রাম্প যখন ইরানকে নিয়ে সবচেয়ে কঠোর ভাষা ব্যবহার করছেন, তখনই নিউইয়র্কের অন্যত্র মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিরা বৈঠক করছেন। এই দুই বাস্তবতা একসঙ্গে দেখায় যে যুদ্ধের ভাষা যত কঠোরই হোক, কূটনীতির দরজা এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। আগামী দিনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, সেই দরজা দিয়ে বাস্তব কোনো সমঝোতা বেরিয়ে আসে কি না। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, নিষেধাজ্ঞা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং সামরিক উপস্থিতি নিয়ে দুই দেশের মৌলিক মতপার্থক্য এখনো রয়ে গেছে। তার ওপর যুদ্ধের মানবিক ক্ষয়ক্ষতি, বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলার অভিযোগ এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। জাতিসংঘের এবারের মূল বার্তা ছিল আস্থা পুনর্গঠন। কিন্তু নিউইয়র্কের মঞ্চে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত সেই আস্থার সংকটকেই সামনে নিয়ে এসেছে। বাংলাদেশের ড. খলিলুর রহমানের সভাপতিত্বে পরিচালিত ৮১তম সাধারণ পরিষদে এখন বড় পরীক্ষা হলো, বিশ্বের পরস্পরবিরোধী শক্তিগুলোকে অন্তত আলোচনার টেবিলে ধরে রাখা যায় কি না। ট্রাম্পের বক্তব্যে সামরিক শক্তির ভাষা যেমন স্পষ্ট হয়েছে, তেমনি তাঁর পরবর্তী মন্তব্যে আলোচনার সম্ভাবনাও উঠে এসেছে। ইরানি প্রতিনিধিদলের হল ত্যাগ দুই দেশের রাজনৈতিক দূরত্বের প্রতীক হলেও পরবর্তী তিন ঘণ্টার বৈঠক দেখিয়েছে, সেই দূরত্বের মাঝেও যোগাযোগের পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কোনো পক্ষের চূড়ান্ত বিজয় নয়, বরং প্রকাশ্য হুমকি, সামরিক চাপ ও কূটনৈতিক আলোচনার এই জটিল সমীকরণ কোন দিকে যায়। জাতিসংঘে ট্রাম্পের বক্তব্য সেই প্রশ্নকে আরও তীব্র করেছে: ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র কি শেষ পর্যন্ত একটি নতুন চুক্তির দিকে যাবে, নাকি যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হবে? উত্তর এখনো অজানা। তবে নিউইয়র্কের এই অধিবেশন প্রমাণ করেছে, ইরান সংকট এখন শুধু ওয়াশিংটন ও তেহরানের দ্বিপক্ষীয় বিরোধ নয়; এটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, জ্বালানি বাজার, পারমাণবিক বিস্তার, আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতিসংঘের কার্যকারিতা নিয়ে বৃহত্তর প্রশ্নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে গেছে।
