বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে রাশিয়া, চীন ও ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর টানাপোড়েন যখন নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে, ঠিক সেই সময়ে কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে বসছে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা—এসসিওর বিশেষ শীর্ষ সম্মেলন। সংগঠনটির ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এই সম্মেলনে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান অংশ নিচ্ছেন।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের পাশাপাশি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফেরও সম্মেলনে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। সম্মেলনের সভাপতিত্ব করছেন কিরগিজস্তানের প্রেসিডেন্ট সাদির জাপারভ।
পশ্চিমা আধিপত্যের বিকল্প কাঠামো নিয়ে আলোচনা
এসসিও প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য ছিল আঞ্চলিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং সদস্য দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক জোরদার করা। তবে গত কয়েক বছরে সংগঠনটি আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতেও ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
রাশিয়া ও চীনের নেতারা বিভিন্ন সময়ে এসসিওকে একটি বহুমেরু আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান জানানোর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করেছেন। বিশেষ করে পশ্চিমা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবের বিকল্প হিসেবে এশিয়াকেন্দ্রিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টি তাদের বক্তব্যে গুরুত্ব পেয়েছে।
তবে এসসিও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো দেশের বিরুদ্ধে সামরিক বা রাজনৈতিক জোট হিসেবে নিজেদের পরিচয় দেয় না।
পুতিন-শি-পেজেশকিয়ানের বৈঠকে নজর
সম্মেলনের পাশাপাশি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের পৃথক বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এসব বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
বিশেষ করে রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামরিক, জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দুই দেশই দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে।
ইউক্রেন ও ইরান সংকটের ছায়া
এসসিওর এবারের সম্মেলন এমন একটি সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে এবং ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতও আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম প্রধান উদ্বেগে পরিণত হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে রাশিয়া-ইরান সহযোগিতা এবং চীনের সঙ্গে উভয় দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক ওয়াশিংটনের বিশেষ নজরে রয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যে মস্কো ও বেইজিংকে ইরানের কাছে সামরিক সরঞ্জাম বা অস্ত্র সরবরাহের বিষয়ে সতর্ক করেছেন। এর মধ্যেই পুতিন ও পেজেশকিয়ানের সম্ভাব্য বৈঠককে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা।
এদিকে, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর পরিচালক জন র্যাটক্লিফের সাম্প্রতিক মস্কো সফরও আলোচনায় এসেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সফরে ইউক্রেন ও ইরানসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে রুশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা হয়ে থাকতে পারে।
নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে চীন-ইরানের অবস্থান
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ সাম্প্রতিক সময়ে আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। স্বর্ণ, প্রযুক্তি, ডিজিটাল সম্পদ, বিমান পরিবহন ও সামুদ্রিক পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতকে লক্ষ্য করে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ওয়াশিংটন।
একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়া দেশ ও প্রতিষ্ঠানগুলোকেও সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে সতর্ক করা হচ্ছে।
ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার চীন অবশ্য জানিয়েছে, নিজেদের জাতীয় ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় তারা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। ইরানি তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা হিসেবেও চীনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
তেহরানও বারবার বলে আসছে, দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও তারা নিজেদের নীতিগত অবস্থান থেকে সরে যাবে না। তবে মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক চাপ ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিতে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
এসসিওতে ইরানের অবস্থান
ইরান ২০২৩ সালে এসসিওর পূর্ণ সদস্য হয়। তেহরানের কাছে এই সংগঠনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কমানো এবং এশিয়ার বৃহৎ অর্থনীতিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগ বৃদ্ধির একটি সম্ভাব্য পথ।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, এসসিওর সদস্যদের সঙ্গে সক্রিয় যোগাযোগ ইরানকে বিকল্প বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সহযোগিতার সুযোগ দিতে পারে। তবে সংকটের সময় সংগঠনটি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জন্য কতটা কার্যকর সহায়তা দিতে পারে, তা নিয়ে প্রশ্নও রয়েছে।
বিশ্বের বড় একটি অংশকে ঘিরে এসসিও
এসসিওর সদস্য দেশগুলো সম্মিলিতভাবে বিশ্বের বিপুল জনসংখ্যা ও অর্থনীতির প্রতিনিধিত্ব করে। সংগঠনটির সদস্যদের মধ্যে রাশিয়া, চীন, ভারত, পাকিস্তান, ইরান, বেলারুশ এবং মধ্য এশিয়ার কয়েকটি দেশ রয়েছে।
এছাড়া তুরস্ক, সৌদি আরব ও কাতারসহ বেশ কয়েকটি দেশ সংলাপ অংশীদার হিসেবে সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। আফগানিস্তান ও মঙ্গোলিয়ার রয়েছে পর্যবেক্ষক মর্যাদা।
এই বিস্তৃত সদস্য ও অংশীদার কাঠামোর কারণে এসসিওকে এশিয়া ও ইউরেশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ বহুপাক্ষিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ঐক্যের পাশাপাশি রয়েছে অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য
এসসিওর প্রভাব বাড়লেও সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সব বিষয়ে অভিন্ন অবস্থান নেই। মধ্য এশিয়ার কৌশলগত অবস্থান, জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদ এবং বাণিজ্যপথকে ঘিরে রাশিয়া ও চীনের নিজস্ব স্বার্থ রয়েছে।
অন্যদিকে চীন, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার সীমান্ত ও কৌশলগত বিরোধও সংগঠনটির অভ্যন্তরীণ ঐক্যের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
ফলে বিশকেকের এবারের সম্মেলন শুধু রাশিয়া, চীন ও ইরানের পশ্চিমাবিরোধী অবস্থান প্রদর্শনের মঞ্চ হবে কি না, তা নয়—এসসিও তার সদস্যদের ভিন্ন ভিন্ন জাতীয় স্বার্থের মধ্যে কতটা কার্যকর সমন্বয় তৈরি করতে পারে, সেটিও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বহুমেরু বিশ্বের দিকে নতুন বার্তা?
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ইরানকে ঘিরে সংঘাত, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এবং চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য উত্তেজনার মধ্যেই এসসিওর ২৫ বছর পূর্তি উদযাপন হচ্ছে।
বিশকেক সম্মেলনে পুতিন, শি জিনপিং ও পেজেশকিয়ানের উপস্থিতি তাই প্রতীকী ও কৌশলগত—দুই দিক থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ। পশ্চিমা চাপের বাইরে বিকল্প অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতা কতটা শক্তিশালী করা যায়, সেটিই আগামী দিনের অন্যতম বড় প্রশ্ন।
তবে এসসিওকে এখনই পশ্চিমা জোটের সরাসরি বিকল্প হিসেবে দেখার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন। সংগঠনটির সদস্যদের পারস্পরিক স্বার্থ ও মতপার্থক্যও যথেষ্ট গভীর। ফলে বিশকেক সম্মেলন থেকে বহুমেরু বিশ্বের পক্ষে শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা এলেও, সেটি বাস্তব ও দীর্ঘমেয়াদি জোট কাঠামোয় কতটা রূপ নেয়, তা নির্ভর করবে পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।
