দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলা বুধবার গভীর রাতে ভয়াবহ ভূমিকম্পের আঘাতে কেঁপে উঠেছে। দেশটির সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে রাজধানী কারাকাসসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ব্যাপক আতঙ্ক, ধ্বংসযজ্ঞ এবং প্রাণহানির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, প্রথমে ৭ দশমিক ২ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে এবং এর অল্প সময় পরেই আরও শক্তিশালী ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দ্বিতীয় ভূমিকম্প অনুভূত হয়, যা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। পরপর দুটি শক্তিশালী কম্পনে রাজধানীর বহু বহুতল ভবন, আবাসিক এলাকা, বাণিজ্যিক স্থাপনা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, মুহূর্তের মধ্যেই মাটি কেঁপে উঠলে আতঙ্কিত মানুষ ঘরবাড়ি, অফিস, বিপণিবিতান ও বিভিন্ন স্থাপনা থেকে ছুটে রাস্তায় নেমে আসে। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ভবনের দেয়াল ধসে পড়ার পাশাপাশি বেশ কয়েকটি ভবন আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে বলে স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে বহু মানুষ আটকা পড়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে এবং উদ্ধারকর্মীরা নিরলসভাবে অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন। বিভিন্ন হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে এবং অতিরিক্ত চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের দ্রুত কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটাপন্ন এবং পরাঘাতের ঝুঁকি এখনও বিদ্যমান থাকায় জনগণকে নিরাপদ স্থানে অবস্থান করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল রাজধানীর পশ্চিমাঞ্চল সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় হওয়ায় কম্পনের তীব্রতা অনেক বেশি অনুভূত হয় এবং দেশের বিভিন্ন প্রদেশের পাশাপাশি প্রতিবেশী কয়েকটি দেশেও এই ভূমিকম্পের প্রভাব পড়েছে। প্রাথমিকভাবে সাগর উপকূলবর্তী এলাকাগুলোর জন্য সতর্কতা জারি করা হলেও পরে পরিস্থিতি মূল্যায়নের ভিত্তিতে তা প্রত্যাহার করা হয়। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এত শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর একাধিক পরাঘাত দেখা দিতে পারে, যা ক্ষতিগ্রস্ত ভবন ও অবকাঠামোর জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করবে। সরকার ইতোমধ্যে জরুরি অবস্থা জারি করে সেনাবাহিনী, পুলিশ, অগ্নিনির্বাপণ বাহিনী, চিকিৎসা দল এবং স্বেচ্ছাসেবকদের উদ্ধার কাজে নিয়োজিত করেছে। বিভিন্ন স্থানে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে, যেখানে গৃহহীন ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে স্থানান্তর করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং বিভিন্ন দেশ মানবিক সহায়তা, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও উদ্ধার সহায়তা পাঠানোর প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে। দুর্যোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণে আরও সময় লাগবে, কারণ অনেক দুর্গম এলাকা এখনও বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। রাতভর উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিত মানুষ খুঁজে বের করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, আর হাজারো মানুষ খোলা আকাশের নিচে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে রাত কাটাচ্ছেন। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির সংখ্যা ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে, তবে এটি যে ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বিধ্বংসী প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর একটি হয়ে উঠেছে, সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে কোনো দ্বিমত নেই।
