ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আগামী মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে হোয়াইট হাউসে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, ট্রাম্পের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণে নেতানিয়াহু সোমবার ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্যে রওনা হবেন। সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে সম্প্রতি আকস্মিকভাবে মৃত্যুবরণ করা রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসি গ্রাহামের শেষকৃত্যে অংশ নেওয়া। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ইসরায়েলের অন্যতম শক্তিশালী সমর্থক হিসেবে পরিচিত গ্রাহামের মৃত্যু ওয়াশিংটন-তেল আবিব সম্পর্কের জন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত তৈরি করেছে। একই সঙ্গে নেতানিয়াহুর এই সফর ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে তার সপ্তম সফর, যা অন্য যেকোনো বিশ্বনেতার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি এবং দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্কের গভীরতাকেই প্রতিফলিত করে।
এই সফর এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আবারও দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের (MoU) ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর সামরিক উত্তেজনা নতুন করে বৃদ্ধি পেয়েছে। ইসরায়েল শুরু থেকেই ওই সমঝোতার বিরোধিতা করেছিল এবং লেবাননে তাদের চলমান সামরিক অভিযান কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে বারবার সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। একই সময়ে ট্রাম্প প্রশাসন লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে আলোচনার তত্ত্বাবধান করছে, যদিও সেই আলোচনায় হিজবুল্লাহকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। দুই দেশ নীতিগতভাবে এমন একটি পরিকল্পনায় সম্মত হয়েছে, যার মাধ্যমে ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলো ধীরে ধীরে লেবাননের সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তরের কথা বলা হয়েছে। তবে বাস্তব পরিস্থিতিতে এখনো উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি এবং অধিকৃত এলাকাগুলোতে ইসরায়েলি উপস্থিতি বহাল রয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তাদের বাহিনী টানা ত্রয়োদশ রাতের মতো ইরানে সামরিক হামলা পরিচালনা করেছে। পাল্টা জবাবে ইরানও মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হামলা অব্যাহত রেখেছে। জর্ডানে একটি মার্কিন ঘাঁটিতে সাম্প্রতিক হামলায় তিনজন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলে অতিরিক্ত সামরিক সক্ষমতা ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম মোতায়েন করছে, যা অনেক বিশ্লেষকের মতে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের পূর্বাভাস হতে পারে।
নেতানিয়াহুর সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট হলো গাজা উপত্যকার চলমান যুদ্ধ। আন্তর্জাতিক মহলে যুদ্ধবিরতির কথা বলা হলেও বাস্তবে ইসরায়েলি বাহিনী গাজায় নিয়মিত বিমান হামলা, স্থল অভিযান এবং নতুন নতুন উচ্ছেদ নির্দেশনা জারি করে যাচ্ছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, গাজার প্রায় ৬৭ শতাংশ মানুষ এখনো তীব্র খাদ্যসংকট বা তার চেয়েও ভয়াবহ মানবিক অবস্থার মধ্যে রয়েছে। স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ৭৩ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে এবং বর্তমান যুদ্ধবিরতির সময়কালেও এক হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলছে, গাজায় চলমান পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের জন্য এক গভীর চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে অধিকৃত পশ্চিম তীরেও সহিংসতা ক্রমেই বাড়ছে। নাবলুসের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ইসরায়েলি বাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীদের অভিযানে চার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে বলে ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। একই ঘটনায় একজন ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী নিহত এবং আরও কয়েকজন আহত হয়েছে বলে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ জানায়। চলতি বছরের শুরু থেকে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীদের হাতে অন্তত ৮৬ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যককে সরাসরি বসতি স্থাপনকারীরা গুলি করে হত্যা করেছে।
ওয়াশিংটন সফরের আগে নেতানিয়াহুকে ঘিরে আন্তর্জাতিক আইন এবং কূটনৈতিক বিতর্কও নতুন করে সামনে এসেছে। নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (ICC) জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানার প্রসঙ্গ তুলে মার্কিন ফেডারেল কর্তৃপক্ষকে নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তারের আহ্বান জানিয়েছেন। যদিও পরে তিনি স্বীকার করেন যে নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগের এমন কোনো আইনগত ক্ষমতা নেই। ট্রাম্প প্রশাসন অবশ্য শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের অবস্থানের বিরোধিতা করে আসছে এবং আদালতের কর্মকাণ্ডে সহায়তাকারী কর্মকর্তা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে নেতানিয়াহুকে কোনো অবস্থাতেই গ্রেপ্তার করা হবে না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহু-ট্রাম্প বৈঠকে ইরানকে ঘিরে সামরিক কৌশল, গাজা যুদ্ধ, লেবানন পরিস্থিতি, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো প্রধান আলোচ্য বিষয় হতে পারে। একই সঙ্গে মার্কিন কংগ্রেসে বিবেচনাধীন নতুন প্রতিরক্ষা বাজেট, যার মাধ্যমে দুই দেশের সামরিক সমন্বয় আরও গভীর করার প্রস্তাব রয়েছে, সেটিও আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে। তবে এসবের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের জনমতে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—উভয় শিবিরের ভেতরেই ইসরায়েল নীতিকে কেন্দ্র করে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অনেক প্রভাবশালী রক্ষণশীল বিশ্লেষকও অভিযোগ করছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতে ইসরায়েলের কৌশল যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সংকটে জড়িয়ে ফেলছে।
সব মিলিয়ে নেতানিয়াহুর আসন্ন ওয়াশিংটন সফর শুধু একটি আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যের দ্রুত পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা, গাজা যুদ্ধ, ইরান সংকট, লেবানন পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক আইন এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল কৌশলগত জোটের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণে এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই বৈঠকের ফলাফল শুধু দুই দেশের সম্পর্ক নয়, বরং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির গতিপথেও উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংকট ঘিরে হোয়াইট হাউসে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বসছেন ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু
