ইরানের ‘পারমাণবিক অস্পষ্টতা’: মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ডিটারেন্স নাকি বৈশ্বিক পারমাণবিক ঝুঁকি? — ওয়াশিংটন/তেহরান: ইরানকে ঘিরে চলমান সামরিক সংঘাতের সবচেয়ে উদ্বেগজনক প্রশ্নগুলোর একটি শুধু ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নয়; বরং কোনো পক্ষ যদি এই সংঘাতে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করে, তার পরিণতি কত দূর গড়াতে পারে। সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও বিশ্লেষক ল্যারি সি. জনসন এমন আশঙ্কা তুলে ধরেছেন—ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক হামলা হলে তা রাশিয়া, চীন, উত্তর কোরিয়া ও পাকিস্তানের মতো পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর কৌশলগত হিসাব বদলে দিতে পারে। একটি পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ঘটনা শুধু একটি যুদ্ধের সামরিক সীমা ভাঙবে না; বরং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের রাজনৈতিক ও কৌশলগত সীমারেখাও দুর্বল করতে পারে। সাবেক মার্কিন কংগ্রেস সদস্য মার্জরি টেলর গ্রিন দাবি করেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে মার্কিন কৌশলগত বৈঠকে আলোচনা হচ্ছে। তবে এ দাবির স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ্যে না থাকায় এটিকে নিশ্চিত সরকারি সিদ্ধান্ত নয়, বরং একজন সাবেক কংগ্রেস সদস্যের দাবি হিসেবে দেখা উচিত। ইরানের হাতে বর্তমানে প্রস্তুত ও মোতায়েনযোগ্য পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে—এমন নির্ভরযোগ্য প্রকাশ্য প্রমাণ নেই; একইভাবে ইরান গোপনে কোনো অস্ত্র তৈরি করে রেখেছে কি না, সেটিও নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তবে দেশটির ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক উদ্বেগের কারণ। ইরান ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উৎপাদন করেছে, যা অস্ত্র-গ্রেডের প্রায় ৯০ শতাংশের কাছাকাছি; কিন্তু ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম থাকা এবং একটি কার্যকর পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি ও মোতায়েন করা এক বিষয় নয়। এখানেই আসে ‘nuclear ambiguity’ বা পারমাণবিক অস্পষ্টতার প্রশ্ন। প্রতিপক্ষ যদি নিশ্চিত না হয় যে কোনো রাষ্ট্রের কাছে পারমাণবিক প্রতিশোধ নেওয়ার সক্ষমতা আছে কি না, সেই অনিশ্চয়তা আক্রমণের সিদ্ধান্তকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে। ইরানের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যদি ধরে নেয় যে দেশটি পারমাণবিক অস্ত্রের খুব কাছাকাছি, তাহলে বড় ধরনের হামলা তেহরানকে ভবিষ্যতে অস্ত্র তৈরির সিদ্ধান্তে আরও দৃঢ় করতে পারে। ইরানের ওপর পারমাণবিক হামলার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি শুধু ইরানের সম্ভাব্য প্রতিশোধ নয়; বরং অন্য পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো সেই নজিরকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। তবে একটি হামলা হলেই রাশিয়া, চীন, উত্তর কোরিয়া বা পাকিস্তান পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করবে—এমন সরল সিদ্ধান্ত টানা ঠিক হবে না; বরং আশঙ্কাটি হলো, পারমাণবিক ব্যবহারের রাজনৈতিক সীমারেখা দুর্বল হলে দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক কৌশলগত স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সব মিলিয়ে, ইরানের ‘পারমাণবিক অস্পষ্টতা’কে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুবিধা বলা যেতে পারে, কিন্তু এটিকে নিশ্চিত পারমাণবিক ডিটারেন্স বলা যাবে না—কারণ ইরানের হাতে প্রস্তুত পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে কি না, তার প্রকাশ্য প্রমাণ নেই। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তাই শুধু “ইরানের হাতে বোমা আছে কি না?” নয়; বরং “ইরানের হাতে বোমা আছে বলে প্রতিপক্ষ বিশ্বাস করতে শুরু করলে, সেই বিশ্বাসই কি তাকে আক্রমণ থেকে বিরত রাখার জন্য যথেষ্ট?” পারমাণবিক যুগে বাস্তব সক্ষমতার পাশাপাশি অনিশ্চয়তা, ভয় এবং সম্ভাব্য প্রতিশোধও ডিটারেন্সের অংশ হয়ে উঠতে পারে; ইরানের ক্ষেত্রে সেই অনিশ্চয়তাই হয়তো তার গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদগুলোর একটি, তবে একই সঙ্গে এটি ভুল হিসাবেরও ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করে।
