দুঃখের বিষয় হলেও সত্য যে, আমরা মুসলমান হয়েও আহলে বাইত তথা আউলাদে রাসূলকে যথাযথভাবে চিনি না, এমনকি তাঁদের পরিচয় জানারও চেষ্টা করি না। আবার অনেক সময় চিনলেও তাঁদের প্রাপ্য সম্মান ও ভালোবাসা প্রদর্শন করি না। এটি নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য গভীর অনুশোচনার বিষয়। প্রকৃতপক্ষে আহলে বাইত হলেন আল্লাহর রাসূল (ﷺ)–এর অতি প্রিয় ও স্নেহধন্য পরিবার। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন: قل لا اسئلكم عليه اجرا الا المودة فى القربى অর্থাৎ, “(হে হাবীব!) আপনি বলে দিন, আমি এ দাওয়াতের বিনিময়ে তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান চাই না, শুধু আমার নিকটাত্মীয়দের প্রতি ভালোবাসা চাই।” (সূরা আশ-শূরা: ২৩)। এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর সাহাবায়ে কিরাম বিনয়ের সঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার সেই নিকটাত্মীয় কারা, যাঁদের প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শন আমাদের জন্য অপরিহার্য?” (তাফসীরে ইবনে কাসীর, ২য় খণ্ড, পৃ. ২১১)। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ করেন, “তাঁরা হলেন হযরত আলী, হযরত ফাতিমা, হযরত ইমাম হাসান ও হযরত ইমাম হোসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুম এবং তাঁদের উভয়ের সন্তানগণ।” (যারকানী আলাল মাওয়াহিব, সাওয়াইক্বে মুহরিক্বা, খুৎবাতে মুহররম, পৃ. ২৫৬)। বাস্তবিক অর্থে আহলে বাইত ছিলেন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)–এর সর্বাধিক আপনজন। পবিত্র কুরআনে তাঁদের পবিত্রতার ঘোষণাও এসেছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: “হে আহলে বাইত! নিশ্চয় আল্লাহ চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে পরিপূর্ণভাবে পবিত্র করতে।” (সূরা আহযাব: ৩৩)। এ আয়াত নাযিল হলে হযরত আবু সাঈদ খুদরী, হযরত আয়েশা সিদ্দিকা ও উম্মে সালামা (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) বলেন, এ আয়াত হযরত ফাতিমা, হযরত আলী, ইমাম হাসান ও ইমাম হোসাইন (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)-এর সম্পর্কে নাযিল হয়েছে। বহু মুফাসসিরের মতে আহলে বাইত বলতে “আহলে আবা” অর্থাৎ চাদরাবৃত পবিত্র ব্যক্তিদের বোঝানো হয়েছে। হযরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, একদিন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) একটি কালো নকশাযুক্ত চাদর গায়ে জড়িয়ে বের হলেন। প্রথমে ইমাম হাসান (রা.) এলে তাঁকে চাদরের ভেতরে নিলেন, এরপর ইমাম হোসাইন (রা.) এলেন, তাকেও অন্তর্ভুক্ত করলেন। পরে হযরত ফাতিমা (রা.) এলেন, তাঁকেও চাদরের নিচে স্থান দিলেন। সর্বশেষ হযরত আলী (রা.) এলে তাকেও সেই নূরানী চাদরের অন্তর্ভুক্ত করলেন এবং তিলাওয়াত করলেন: “হে আহলে বাইত! নিশ্চয় আল্লাহ চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে।” (সূরা আহযাব: ৩৩)। এরপর তিনি দোয়া করলেন: اللهم هؤلاء أهل بيتي وخاصتي فأذهب عنهم الرجس وطهرهم تطهيرا অর্থাৎ, “হে আল্লাহ! এরাই আমার আহলে বাইত ও আমার নিকটতম পরিবার। আপনি তাঁদের থেকে অপবিত্রতা দূর করুন এবং তাঁদেরকে পরিপূর্ণভাবে পবিত্র করুন।” (সহীহ মুসলিম; মিশকাত শরীফ, পৃ. ৫৬৮)। অন্য এক হাদীসে হযরত উসামা ইবনে যায়দ (রা.) বর্ণনা করেন, আমি একদিন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)–এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে দেখলাম তিনি একটি কম্বল জড়িয়ে রেখেছেন। মনে হলো ভেতরে কিছু রয়েছে। আমি জিজ্ঞেস করলে তিনি কম্বল সরিয়ে দেখালেন—তাঁর কোলে ইমাম হাসান ও ইমাম হোসাইন (রা.) বসে আছেন। তখন তিনি দোয়া করলেন: اللهم إني أحبهما فأحبهما وأحب من يحبهما অর্থাৎ, “হে আল্লাহ! আমি এ দু’জনকে ভালোবাসি। আপনিও তাঁদের ভালোবাসুন এবং যারা তাঁদের ভালোবাসবে, তাঁদেরও ভালোবাসুন।” (তিরমিযী শরীফ; মিশকাত শরীফ, পৃ. ৫৭০)। অতএব স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, আহলে বাইত হলেন হযরত আলী, হযরত ফাতিমা, হযরত ইমাম হাসান, হযরত ইমাম হোসাইন (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) এবং তাঁদের পবিত্র বংশধরগণ। আহলে বাইতের মর্যাদা: যবেহে ইসমাঈলের যে ঘটনা “যিবহে আযীম” দ্বারা পূর্ণতা লাভ করে, আল্লামা ইকবাল (রহ.) বলেন: “সিররে ইবরাহীম ও ইসমাঈল বুয়দ, ইয়ানী ইসমাঈল রা তাফসীল বুয়দ।” অর্থাৎ হযরত ইবরাহীম (আ.) ও হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর কুরবানির ঘটনার গভীর রহস্যের বাস্তব প্রতিফলন ঘটেছে কারবালার প্রান্তরে ইমাম হোসাইন (রা.)-এর শাহাদাতের মাধ্যমে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)–এর ওফাতের পর হযরত আলী (রা.) ও হযরত ফাতিমা (রা.)-এর বংশধারা অব্যাহত থাকে এবং কারবালার ময়দানে তাঁদের পবিত্র রক্ত ইসলামের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। আহলে বাইত তথা আউলাদে রাসূলকে আল্লাহ তাআলা যে বিশেষ মর্যাদা দান করেছেন, তা সাধারণ মুমিনদের জন্য নির্ধারিত নয়। কারণ তাঁরা হলেন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)–এর পবিত্র বংশধর। ইমাম হাসান ও ইমাম হোসাইন (রা.)-কে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজের সন্তানদের ন্যায় ভালোবাসতেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেন, আমি দেখেছি নবী করীম (ﷺ) ইমাম হাসান ও ইমাম হোসাইনের হাত ধরে বলেছেন, “এরা আমার সন্তান।” (দায়লামী, আল-ফিরদাউস, ৪/৩৩৬, হাদীস: ৫৯৭৩)। হযরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তাঁরা ছিলেন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)–এর সঙ্গে সর্বাধিক সাদৃশ্যপূর্ণ। (আল-ইসাবা, ২/৭৭, হাদীস: ১৭২৬)। তাবারানীর বর্ণনায় হযরত আলী (রা.) বলেন, ইমাম হাসান (রা.) ছিলেন বক্ষ থেকে মাথা পর্যন্ত এবং ইমাম হোসাইন (রা.) ছিলেন বক্ষ থেকে পদযুগল পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (ﷺ)–এর অবিকল সাদৃশ্যপূর্ণ। (আল-মুজামুল কবির, ৩/২৯, হাদীস: ২৫৭)। আহলে বাইত সর্বশ্রেষ্ঠ ও সম্মানিত বংশের অধিকারী। নবী-বংশ সর্বোচ্চ মর্যাদা ও সম্মানের অধিকারী। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ করেছেন, “আল্লাহ তাআলা হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর বংশধরদের মধ্য থেকে কিনানা গোত্রকে নির্বাচন করেছেন, কিনানা থেকে কুরাইশকে, কুরাইশ থেকে বনি হাশিমকে এবং বনি হাশিম থেকে আমাকে মনোনীত করেছেন।”
