উত্তর কোরিয়ার প্রধান পারমাণবিক কেন্দ্র ইয়ংবিয়নে নতুন একটি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনা নির্মাণের তথ্য শনাক্ত করেছে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বা আইএইএ, যা পিয়ংইয়ংয়ের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির সম্প্রসারণ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। আইএইএর সাম্প্রতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইয়ংবিয়ন পারমাণবিক কমপ্লেক্সে নির্মিত নতুন দুইতলা ভবনটি উত্তর কোরিয়ার দ্বিতীয় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনা হতে পারে এবং সেখানে দুই তলাতেই গ্যাস সেন্ট্রিফিউজের ক্যাসকেড স্থাপনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। উপগ্রহচিত্র এবং উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি বিশ্লেষণ করে এই মূল্যায়ন করা হয়েছে। আইএইএর তথ্য অনুযায়ী, নতুন ভবনটিতে সর্বোচ্চ ২৮টি সেন্ট্রিফিউজ ক্যাসকেড স্থাপনের সক্ষমতা থাকতে পারে, যা দেশটির ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ অবকাঠামোর আকার আরও বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। আইএইএর এই পর্যবেক্ষণ এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন সংস্থাটির কোনো পরিদর্শক ২০০৯ সালের পর থেকে উত্তর কোরিয়ার ভেতরে প্রবেশ করতে পারেননি। ফলে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচির বর্তমান অবস্থা পর্যবেক্ষণে আইএইএকে উপগ্রহচিত্র, প্রকাশ্য তথ্য এবং উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি ও ভিডিওর ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে হচ্ছে। আইএইএর প্রতিবেদনে ইয়ংবিয়নের পাশাপাশি পিয়ংইয়ংয়ের কাছাকাছি কাংসন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনাতেও সম্প্রসারণের লক্ষণ পাওয়া গেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০২৪ সালে নির্মিত কাংসন স্থাপনার একটি সম্প্রসারিত অংশে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে কার্যক্রম শুরু হওয়ার ইঙ্গিত রয়েছে। এর অর্থ হলো, উত্তর কোরিয়া শুধু ইয়ংবিয়নেই নয়, একাধিক স্থানে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ইয়ংবিয়ন উত্তর কোরিয়ার দীর্ঘদিনের পারমাণবিক কর্মসূচির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র এবং অতীতে এই স্থাপনায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও পারমাণবিক জ্বালানি উৎপাদনসংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রমের প্রমাণ পাওয়া গেছে। আইএইএর আগের মূল্যায়নেও দেখা গেছে, ইয়ংবিয়নের বিদ্যমান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনায় একাধিক সেন্ট্রিফিউজ ক্যাসকেড রয়েছে এবং সেখানকার অবকাঠামো সময়ের সঙ্গে সম্প্রসারিত হয়েছে। নতুন ভবনটির নির্মাণ সেই সম্প্রসারণ প্রক্রিয়াকে আরও এগিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। আইএইএর মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি উত্তর কোরিয়ার ইয়ংবিয়ন ও কাংসন উভয় স্থানে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা এবং সম্প্রসারণ নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এসব কার্যক্রমের পাশাপাশি অস্ত্র-গ্রেড পারমাণবিক উপাদান উৎপাদন বাড়ার ইঙ্গিত আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক। আইএইএ সরাসরি উত্তর কোরিয়ার স্থাপনাগুলোতে প্রবেশ করতে না পারায় নতুন ভবনের প্রকৃত কার্যক্রম এবং সেখানে ব্যবহৃত সেন্ট্রিফিউজের সুনির্দিষ্ট সক্ষমতা সরাসরি যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংস্থাটির নিজস্ব নথিতেও বলা হয়েছে, মাঠপর্যায়ে প্রবেশাধিকার না থাকলে কোনো স্থাপনার কার্যক্রম, নকশা বা প্রকৃত উদ্দেশ্য পুরোপুরি নিশ্চিত করা কঠিন। তবে উপগ্রহচিত্র, ভবনের কাঠামো এবং উত্তর কোরিয়ার প্রকাশিত তথ্যের সমন্বিত বিশ্লেষণ দেশটির সমৃদ্ধকরণ অবকাঠামো সম্প্রসারণের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিচ্ছে। উত্তর কোরিয়া দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বিভিন্ন প্রস্তাবের বিরোধিতা করে আসছে এবং দেশটির নেতৃত্ব পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচিকে নিজেদের নিরাপত্তা নীতির একটি স্থায়ী অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। অন্যদিকে, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবগুলো উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র ও সংশ্লিষ্ট কর্মসূচির ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। আইএইএর মূল্যায়ন অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়ার চলমান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম ও পারমাণবিক অবকাঠামোর সম্প্রসারণ এসব আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। উত্তর কোরিয়ার পক্ষ থেকে আইএইএর কর্তৃত্ব ও সমালোচনাকে প্রত্যাখ্যান করা হলেও উপগ্রহচিত্রভিত্তিক সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ দেশটির পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে ইয়ংবিয়নে নতুন স্থাপনা এবং কাংসনে সম্প্রসারিত অবকাঠামোর কার্যক্রম একই সময়ে এগিয়ে যাওয়ার তথ্য থেকে বোঝা যায় যে পিয়ংইয়ং তার পারমাণবিক উপাদান উৎপাদনের সক্ষমতা দীর্ঘমেয়াদে বাড়ানোর চেষ্টা করছে। এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপানসহ উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি পর্যবেক্ষণকারী দেশগুলোর জন্য নতুন নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। আইএইএর সরাসরি পরিদর্শন আবার শুরু না হওয়া পর্যন্ত উপগ্রহচিত্র ও উন্মুক্ত উৎসের তথ্যই উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচির পরিবর্তন বোঝার অন্যতম প্রধান মাধ্যম হয়ে থাকবে। সর্বশেষ তথ্য তাই ইঙ্গিত করছে যে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক চাপের মধ্যেও উত্তর কোরিয়া তার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ অবকাঠামো সম্প্রসারণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে এবং এর ফলে দেশটির পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সম্ভাব্য সক্ষমতা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ আরও গভীর হচ্ছে।
