ইরানে সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ৬২৪ জন সামরিক সদস্য আহত হয়েছেন বলে পেন্টাগনের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা গেছে। ২৫ জুলাই প্রকাশিত এই পরিসংখ্যানে দেখা যায়, আহতদের মধ্যে ৪১৭ জন ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ এবং আরও ২০৭ জন ‘ওভারসিজ অপারেশনস’-এর আওতায় দায়িত্ব পালনকালে আহত হয়েছেন। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ফেব্রুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলার নির্দেশ দেওয়ার পর শুরু হওয়া সংঘাত এপ্রিল মাসে যুদ্ধবিরতি এবং জুনে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে কিছুটা প্রশমিত হওয়ার ইঙ্গিত দিলেও বাস্তবে দুই পক্ষের মধ্যে হামলা-পাল্টা হামলা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বরং সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে পেন্টাগনের হতাহত সংক্রান্ত পরিসংখ্যানে অস্বাভাবিক পরিবর্তন নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। গত সপ্তাহ পর্যন্ত পেন্টাগনের তথ্য অনুযায়ী ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’-তে ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং ৪৮২ জন আহত হয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা ছাড়াই নিহত চার সেনার নাম ওই তালিকা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয় এবং বৃহস্পতিবার প্রকাশিত সংশোধিত তথ্যে নিহতের সংখ্যা ১৪ জনে নামিয়ে আনা হয়। একই সঙ্গে নিহত ওই চার সেনাকে ‘ওভারসিজ অপারেশনস’ নামে নতুন একটি পৃথক তালিকায় স্থানান্তর করা হয়, যেখানে ২০২৬ সালের ৭ জুলাই থেকে সংঘটিত হতাহতের তথ্য সংরক্ষণ করা হচ্ছে। বর্তমানে সেই তালিকায় চারজন নিহত সেনার নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই নীরব পরিবর্তন সরকারি তথ্যের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপীয় কমান্ডের সাবেক কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল বেন হজেস বলেছেন, বর্তমান প্রশাসন শুধু হতাহতের প্রকৃত সংখ্যাই নয়, পুরো যুদ্ধের বাস্তব চিত্র তুলে ধরতেও হিমশিম খাচ্ছে এবং তথ্য উপস্থাপনে অসঙ্গতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। একই ধরনের সমালোচনা এসেছে রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য থমাস ম্যাসির কাছ থেকেও। তিনি হতাহতের তথ্যকে বিভিন্ন অভিযানের নামে আলাদা করে দেখানোর পদ্ধতিকে ‘হাস্যকর চাল’ বলে মন্তব্য করেছেন এবং এর মাধ্যমে প্রকৃত পরিস্থিতি আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন। এদিকে পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পার্নেল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দাবি করেছেন, তথ্যের এই পরিবর্তন ইচ্ছাকৃত নয়; বরং এটি একটি ‘সাময়িক কারিগরি সমস্যার’ ফল এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তা দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করছে। তবে এই ব্যাখ্যা সমালোচকদের সন্তুষ্ট করতে পারেনি। গত ২১ জুলাই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেও সামাজিক মাধ্যমে ইরান সংঘাতে ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার কথা উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু পরে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানায়, পেন্টাগনের ওয়েবসাইটে ‘ওভারসিজ অপারেশনস’ নামে নতুন একটি বিভাগ যুক্ত করা হয়েছে, যেখানে সম্প্রতি নিহত চার সেনা এবং আহত ২০৭ জনের তথ্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। যদিও ওই ২০৭ জনের সবাই সরাসরি ইরান সংঘাতে আহত হয়েছেন কি না, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। বিশ্লেষকদের ধারণা, জুলাই মাসে নিহত চার সেনার তথ্য পৃথকভাবে উপস্থাপনের উদ্দেশ্যেই এই প্রশাসনিক পরিবর্তন আনা হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি কার্যত ভেঙে পড়ার পর এবং যুদ্ধবিরতি ‘সমাপ্ত’ ঘোষণা হওয়ার পরপরই ওই চার সেনা নিহত হন। তাদের মধ্যে ১৭ জুলাই জর্ডানে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তিনজন এবং ইরাকে একজন মার্কিন সেনা প্রাণ হারান। জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে টানা ১৩ রাত ধরে দুই পক্ষের মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চললেও গত শুক্রবার থেকে সংঘাতের তীব্রতা কিছুটা কমেছে। তবে হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা, যুদ্ধের বাস্তব পরিস্থিতি এবং সরকারি তথ্য প্রকাশের স্বচ্ছতা নিয়ে যে বিতর্ক শুরু হয়েছে, তা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান এবং প্রশাসনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
