শ্রীলঙ্কার তিনটি পৃথক কারাগারে নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ায় দেশটির কারা নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ আরও গভীর হয়েছে। রাজধানী কলম্বোর নিউ ম্যাগাজিন কারাগার, কুরুভিটা কারাগার এবং উপকূলীয় শহর নেগোম্বোর একটি উন্মুক্ত কারাগারে সংঘটিত অস্থিরতায় অন্তত তিনজন বন্দি নিহত এবং আরও ২৩ জন আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দাঙ্গা পুলিশ, বিশেষ টাস্ক ফোর্স এবং অতিরিক্ত নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। সরকার ঘটনাগুলোর পেছনে সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র কিংবা মাদক ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর পরিকল্পিত ভূমিকা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে বিস্তৃত তদন্ত শুরু করেছে।
সরকারি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার গভীর রাতে কলম্বোর নিউ ম্যাগাজিন কারাগারে প্রায় ৪০ জন বন্দি তাদের সেল ভেঙে বেরিয়ে এলে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে গেলে নিরাপত্তা বাহিনী হস্তক্ষেপ করে এবং ওই ঘটনায় একজন বন্দি নিহত হন। পরদিন সকালে রাজধানী থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরের কুরুভিটা কারাগারেও আরেক দফা সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে আরও দুই বন্দির মৃত্যু হয়। দুই কারাগারের সংঘর্ষে আহত ২৩ জন বন্দিকে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
এদিকে একই সময়ে নেগোম্বোর একটি উন্মুক্ত কারাগারেও বন্দিদের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে এবং অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করে। তিনটি কারাগারেই বহু বন্দি কারাগারের ছাদে উঠে যান কিংবা উন্মুক্ত স্থানে জড়ো হন। পরে নিরাপত্তা বাহিনী ধাপে ধাপে তাদের নিজ নিজ ওয়ার্ডে ফিরিয়ে নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
শ্রীলঙ্কার জননিরাপত্তা মন্ত্রী আনন্দা উইজেপালা সংসদে বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, কারাগারগুলোর সহিংসতার সঙ্গে মাদক ব্যবসায়ী চক্র এবং প্রতিদ্বন্দ্বী অপরাধী গোষ্ঠীর বিরোধ জড়িত থাকতে পারে। তবে একই সময়ে একাধিক কারাগারে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ায় সরকার বিষয়টিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখছে না। তাঁর ভাষায়, সব ঘটনাকে একসঙ্গে বিবেচনা করলে এর পেছনে পূর্বপরিকল্পনার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা থাকতে পারে। তবে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষ হওয়ার আগে সরকার চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চায় না।
বিশ্লেষকদের মতে, একাধিক কারাগারে একই সময়ে অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়া শ্রীলঙ্কার কারা প্রশাসনের জন্য একটি বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটির কারাগারগুলোতে অতিরিক্ত বন্দি, সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের প্রভাব, মাদক পাচার এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেছে। সর্বশেষ ঘটনাগুলো সেই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
এই সহিংসতার মাত্র এক মাস আগেই নেগোম্বোর একটি কারাগারে টানা দুই দিনের সংঘর্ষে ১০ জন কারা কর্মকর্তা এবং ২০ জন বন্দির প্রাণহানি ঘটে, যা দেশটির সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী কারাগার-সংঘর্ষগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। নতুন করে সংঘটিত সহিংসতা সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা তৈরি করেছে এবং কারাগারগুলোর নিরাপত্তা, গোয়েন্দা নজরদারি ও বন্দি ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারের ওপর চাপ আরও বাড়িয়েছে।
সরকার বলছে, সহিংসতার প্রকৃত কারণ, সম্ভাব্য সমন্বয়কারী এবং এর সঙ্গে সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের সম্পৃক্ততা নির্ধারণে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যৌথভাবে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে দেশের সব গুরুত্বপূর্ণ কারাগারে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে, যাতে নতুন করে কোনো অস্থিরতা বা সহিংসতা ছড়িয়ে পড়তে না পারে।
