ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে সংঘাত আরও তীব্র হয়ে ওঠার মধ্যে রেড সাগরবন্দর মোখায় জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ একটি কম্পাউন্ড হুথি বাহিনী দখল করায় গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘের কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, ওই স্থাপনা ও সেখানে থাকা সম্পদের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে যুদ্ধ ও সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত ইয়েমেনি জনগোষ্ঠীর কাছে জরুরি মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর কার্যক্রম আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে। জাতিসংঘের উপমুখপাত্র ফারহান হক নিউইয়র্কে সাংবাদিকদের জানান, হুথিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা কর্তৃপক্ষ মোখায় জাতিসংঘের কয়েকটি সংস্থার ব্যবহৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক কম্পাউন্ড ও এর সম্পদ দখল করেছে। ওই স্থাপনাটি এলাকায় মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া জাতিসংঘের কর্মীদের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। তবে কম্পাউন্ড দখলের আগে সেখানে কর্মরত সব জাতিসংঘকর্মী নিরাপদে সরে যেতে সক্ষম হয়েছেন এবং তাদের সবাই নিরাপদে আছেন বলে নিশ্চিত করেছে জাতিসংঘ। ফারহান হক বলেন, মানবিক সহায়তার স্থাপনা ও সম্পদ সব সময় সম্মান ও সুরক্ষিত থাকা প্রয়োজন এবং সংঘাতের মধ্যেও মানবিক সংস্থাগুলোকে নিরাপদ ও বাধাহীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে, যাতে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের কাছে জীবন রক্ষাকারী সহায়তা পৌঁছানো অব্যাহত থাকে। জাতিসংঘের এই উদ্বেগ এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে হুথি বাহিনীর সামরিক তৎপরতা বিস্তৃত হচ্ছে এবং মোখা ও এর আশপাশের এলাকায় নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত আরও প্রায় ১৮ হাজার পরিবার তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে। সংঘাত থেকে বাঁচতে এসব বেসামরিক মানুষ তায়েজ, এডেন, লাহিজ ও আবিয়ানসহ বিভিন্ন এলাকায় আশ্রয়ের সন্ধান করছে। এর ফলে আগে থেকেই দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকটে থাকা ইয়েমেনে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা আরও বাড়ছে এবং স্থানীয় পর্যায়ে খাদ্য, আশ্রয়, চিকিৎসা ও অন্যান্য জরুরি সহায়তার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। জাতিসংঘ জানিয়েছে, নিরাপত্তাজনিত বিধিনিষেধ, যোগাযোগব্যবস্থার ক্ষতি এবং অর্থের সংকট মানবিক ত্রাণ কার্যক্রমকে আরও বাধাগ্রস্ত করছে। দ্রুত বিতরণের জন্য প্রস্তুত করা প্রায় ১৫ হাজার জরুরি সহায়তা কিট সড়ক যোগাযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এডেনে আটকে রয়েছে। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক লড়াইয়ে মোখা বন্দরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণে সেখানে কার্যক্রমও স্থগিত রয়েছে। জাতিসংঘের কর্মকর্তারা বলছেন, এসব পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে সংঘাতপীড়িত জনগণের কাছে জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। মোখায় বর্তমানে জাতিসংঘের কোনো কর্মী অবস্থান করছেন না। তবে সংঘাতপ্রবণ অন্যান্য গভর্নরেটে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় কর্মীরা দায়িত্ব পালন করছেন। ফারহান হকের তথ্য অনুযায়ী, তায়েজে জাতিসংঘের ১২ জন এবং আল-তুরবাহ এলাকায় ১১ জন স্থানীয় কর্মী রয়েছেন। ইয়েমেনে অতীতে মানবিক সহায়তাকর্মীদের ওপর হামলা ও নিরাপত্তা ঝুঁকির ঘটনা থাকায় জাতিসংঘের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা বিভাগ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং মাঠপর্যায়ে সংস্থাটির উপস্থিতি ও কার্যক্রমের ধরন নিয়মিত পর্যালোচনা করা হচ্ছে। জাতিসংঘ বলছে, তাদের সব কর্মীর নিরাপত্তা, বিশেষ করে সংঘাতপূর্ণ এলাকায় দায়িত্ব পালন করা স্থানীয় কর্মীদের সুরক্ষা, সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। মোখা ও ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে সামরিক পরিস্থিতির পরিবর্তন একই সঙ্গে দেশটির মানবিক সংকটের নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। দীর্ঘদিনের যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি, অবকাঠামোর ক্ষতি এবং ত্রাণ কার্যক্রমে বাধার কারণে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। জাতিসংঘের আহ্বান হলো, মানবিক স্থাপনা ও কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ত্রাণ ও জরুরি সহায়তা যাতে কোনো বাধা ছাড়াই ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে, তা নিশ্চিত করা। সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে নতুন করে আরও বেসামরিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা ইয়েমেনের ইতোমধ্যে জটিল মানবিক পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
