জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস দখলকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলের বসতি সম্প্রসারণ পরিকল্পনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনকে প্রকাশ্যে লঙ্ঘন করছে এবং ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানের সম্ভাবনাকে আরও দুর্বল করে দিচ্ছে। সোমবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তিনি জোর দিয়ে বলেন, দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে প্রতিষ্ঠিত সব ধরনের ইসরাইলি বসতির কোনো আইনি বৈধতা নেই এবং এগুলো আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে অবৈধ। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেন, বসতি সম্প্রসারণের গতি বাড়ানো এবং নতুন আউটপোস্ট স্থাপনের উদ্যোগ দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পথে বড় বাধা সৃষ্টি করছে।
গুতেরেসের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন পশ্চিম তীরে সহিংসতা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং ইসরাইল সরকার বিদ্যমান আউটপোস্টগুলোকে বৈধতা দেওয়ার পাশাপাশি নতুন বসতি স্থাপনের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার ঘোষণা দিয়েছে। গত শুক্রবার ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, তার সরকার কৃষিভিত্তিক আউটপোস্টগুলোকে দ্রুত আইনি স্বীকৃতি দেবে এবং নতুন বসতি স্থাপনের উদ্যোগ আরও জোরদার করবে। এই ঘোষণা আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
জাতিসংঘ দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে, পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ইসরাইলের বসতি স্থাপন আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের পরামর্শমূলক মতামতেও দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলের অব্যাহত দখল এবং বসতি সম্প্রসারণকে আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়। যদিও অনেক আউটপোস্ট ইসরাইলের নিজস্ব আইন অনুযায়ীও আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত নয়, তবুও সেগুলোকে ধীরে ধীরে বৈধ করার সরকারি উদ্যোগ আন্তর্জাতিক সমালোচনাকে আরও তীব্র করেছে।
জাতিসংঘের মহাসচিবের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি বেসামরিক জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও মানবিক আইন অনুযায়ী সহিংসতার জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে জাতিসংঘ এবং এর সহযোগী সংস্থাগুলো ধারাবাহিকভাবে সতর্ক করে আসছে যে বসতি সম্প্রসারণ এবং বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা অঞ্চলের মানবিক সংকটকে আরও গভীর করছে।
মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতিও দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার থেকে পশ্চিম তীরে সংঘর্ষে অন্তত আটজন ফিলিস্তিনি, যার মধ্যে একজন শিশু রয়েছে, নিহত হয়েছে। একই সময়ে দুইজন ইসরাইলিও প্রাণ হারিয়েছেন। বিভিন্ন এলাকায় ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীরা, প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ অনুযায়ী নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতিতে, ফিলিস্তিনিদের ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, জনসাধারণের অবকাঠামো এবং অন্যান্য সম্পত্তিতে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর চালিয়েছে। এসব হামলার ফলে অন্তত দশটি ফিলিস্তিনি পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় কার্যালয় (ওসিএইচএ) জানিয়েছে, চলতি বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত বসতি স্থাপনকারীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক হাজার তিনশোরও বেশি সহিংস ঘটনার নথি সংরক্ষণ করা হয়েছে, যেখানে হতাহত, সম্পত্তি ধ্বংস এবং কৃষিজমির ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা রয়েছে। সংস্থাটি আরও বলেছে, ইসরাইলি বাহিনী পশ্চিম তীরজুড়ে চলাচলের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করায় হাজার হাজার ফিলিস্তিনি জরুরি চিকিৎসাসেবা, কর্মসংস্থান এবং মৌলিক জীবনযাত্রার সুযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরে পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বাহিনী অথবা বসতি স্থাপনকারীদের হাতে অন্তত ৭৭ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১৮ জন শিশু। একই সময়ে ফিলিস্তিনিদের হামলায় তিনজন ইসরাইলি নিহত হওয়ার তথ্যও প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতেও গুতেরেস পশ্চিম তীরে ভূমি নিবন্ধন প্রক্রিয়া পুনরায় চালুর ইসরাইলি সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছিলেন। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, এই পদক্ষেপ ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত বসতি সম্প্রসারণের পথ সুগম করতে পারে। এ মাসের শুরুতে জাতিসংঘের কর্মকর্তারা সতর্ক করেন, পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বৃদ্ধির পাশাপাশি গাজায়ও ইসরাইলি সামরিক অভিযান তীব্রতর হচ্ছে, যার ফলে দুই অঞ্চলে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ও বাস্তুচ্যুতি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণের নতুন পরিকল্পনা এবং একই সঙ্গে চলমান সহিংসতা মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বহুবার দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করলেও বাস্তব পরিস্থিতি সেই লক্ষ্য থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে। জাতিসংঘের সর্বশেষ এই সতর্কবার্তা কেবল বসতি সম্প্রসারণের বিরোধিতা নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইন, বেসামরিক জনগণের সুরক্ষা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় বৈশ্বিক পদক্ষেপের জরুরি প্রয়োজনীয়তার প্রতিফলন হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি সম্প্রসারণের তীব্র নিন্দা জাতিসংঘ মহাসচিবের
