বিশ্বের বৃহত্তম পরিবেশ পুনরুদ্ধার কর্মসূচিগুলোর একটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে চীন গত পাঁচ দশকে গোবি ও তাকলামাকান মরুভূমির বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে প্রায় ৬৬ বিলিয়ন গাছ রোপণ করে এক অভূতপূর্ব সবুজ বেষ্টনী গড়ে তুলেছে। মূলত মরুকরণ রোধ, উর্বর কৃষিজমি রক্ষা এবং ভয়াবহ ধুলিঝড়ের প্রভাব কমানোর লক্ষ্য নিয়ে শুরু হওয়া এই বিশাল উদ্যোগ আজ শুধু পরিবেশ সংরক্ষণের সফল উদাহরণ হিসেবেই নয়, বরং বিজ্ঞানীদের কাছে এক নতুন গবেষণার ক্ষেত্র হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের হাতে গড়ে ওঠা এই বনাঞ্চলের গাছগুলো প্রাকৃতিক বনাঞ্চলের গাছের তুলনায় অনেক দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। গবেষকদের ধারণা, বায়ুমণ্ডলে ক্রমাগত বেড়ে চলা কার্বন ডাই-অক্সাইডের সঙ্গে এই কৃত্রিম বন অত্যন্ত কার্যকরভাবে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম হচ্ছে। তবে এই অস্বাভাবিক দ্রুত বৃদ্ধির প্রকৃত কারণ এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। গবেষকদের মতে, মানুষের তৈরি বন ও প্রাকৃতিক বনের গঠন, পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য এবং কার্বন শোষণের সক্ষমতার মধ্যে কী ধরনের মৌলিক পার্থক্য রয়েছে, সে বিষয়ে আরও গভীর গবেষণা প্রয়োজন। কারণ ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কৃত্রিম বন কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে, তা নির্ভুলভাবে নির্ধারণের জন্য এই প্রশ্নগুলোর উত্তর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীন ১৯৭৮ সালে এই সবুজ বেষ্টনী নির্মাণ প্রকল্প শুরু করে, যার কাজ ২০৫০ সালের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সে সময় গোবি মরুভূমি প্রতি বছর হাজার হাজার বর্গকিলোমিটার উর্বর ভূমি গ্রাস করছিল এবং উত্তর চীনের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ধুলিঝড়ের তীব্রতা বাড়িয়ে তুলছিল। প্রকল্পের প্রাথমিক পর্যায়ে দ্রুত বেড়ে ওঠা কিছু গাছ লাগানো হলেও সেগুলোর বড় অংশই মরুভূমির প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে পারেনি। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, স্থানীয় পরিবেশের উপযোগী বৃক্ষ নির্বাচন এবং ধারাবাহিক বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে চীনের গবেষকেরা সেই ব্যর্থতা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হন। বর্তমানে এই বনাঞ্চল দ্রুত বিস্তার লাভ করছে এবং ইতোমধ্যেই এর ইতিবাচক প্রভাব স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। বনাঞ্চলের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, ধুলিঝড়ের প্রকোপ কমেছে, বেইজিংসহ উত্তরাঞ্চলের বহু শহরের বায়ুর মান উন্নত হয়েছে এবং মরুকরণের অগ্রগতি উল্লেখযোগ্যভাবে নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক এখন আর শুধু মরুভূমি থামিয়ে দেওয়া নয়; বরং মানুষের তৈরি বন ভবিষ্যতে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল থেকে কতটা কার্যকরভাবে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করতে পারবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশে ব্যাপক হারে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি নেওয়া হলেও অধিকাংশ পরিবেশগত হিসাব-নিকাশে প্রাকৃতিক বন ও মানুষের তৈরি বনের মধ্যে যথাযথ পার্থক্য করা হয় না। একই সঙ্গে বনের বয়স, জীববৈচিত্র্য এবং পরিবেশগত জটিলতাও অনেক সময় যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। ফলে ভবিষ্যতের বননীতি, কার্বন শোষণের সঠিক হিসাব এবং বৈশ্বিক জলবায়ু কৌশল নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই নতুন গবেষণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, চীনের এই বিশাল সবুজ বেষ্টনী শুধু মরুকরণ রোধের সফল উদ্যোগ নয়, বরং এটি এমন এক জীবন্ত গবেষণাগার, যা ভবিষ্যতে বনায়ন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং পরিবেশ পুনরুদ্ধার সম্পর্কে বিশ্বের ধারণাকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
